মোবাইল চোরের শাস্তি ২০০ রাকাত নফল নামাজ
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া বাজারে মোবাইল চুরির অভিযোগে এক যুবককে হাতেনাতে আটক করার পর মারধর না করে ২০০ রাকাত নফল নামাজ আদায়ের শাস্তি দেওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ব্যতিক্রমী এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সন্ধ্যায় নোয়াপাড়া বাজারে মোবাইল চুরির অভিযোগে ওই যুবককে স্থানীয়রা আটক করেন। তাকে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে বাজারে শত শত মানুষ জড়ো হন। একপর্যায়ে স্থানীয়রা ওই যুবককে মারধর না করে ধর্মীয় ইবাদতের মাধ্যমে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে তাকে ২০০ রাকাত নফল নামাজ আদায়ের শাস্তি দেওয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানান।
আটক যুবকের বাড়ি মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের দাশপাড়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের তাজু মিয়ার ছেলে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ওই যুবক এর আগেও এলাকায় মোবাইল চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে অতীতে চুরির অভিযোগ বা সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার সময় ধারণ করা একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে ওই যুবককে নামাজ আদায় করতে দেখা যায় বলে জানা গেছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ স্থানীয়দের মারধরের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি মোকাবিলার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার সাধারণ মানুষের আছে কি না।
স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মনির মিয়া বলেন, “চুরির অভিযোগে আটক ব্যক্তিকে মারধর না করে ধর্মীয় ইবাদতের মাধ্যমে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তবে নোয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম আতাউল মোস্তাফা সুহেল বিষয়টিকে সমর্থন করেননি। তিনি বলেন, “আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। তবে কাজটি তারা ঠিক করেনি। নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া উচিত নয়। তাদের উচিত ছিল তাকে পুলিশ প্রশাসনের কাছে তুলে দেওয়া।”
হবিগঞ্জ জজ কোর্টের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. সাজিদুর রহমান বলেন, “বিচার করার এখতিয়ার বিচার বিভাগের। নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়াও অপরাধ। সাধারণ মানুষ নিজেরা আইন হাতে নিয়ে বিচার করতে পারে না। তারা যে কাজটি করেছে, সেটি ঠিক হয়নি। তাদের উচিত ছিল ওই ব্যক্তিকে প্রশাসনের কাছে তুলে দেওয়া।”
মাধবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোহেল রানা বলেন, “আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। খবর নিয়ে জানতে হবে আসলে কী হয়েছে।”
আইনজীবী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ উঠলে তাকে আটকের পর আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করাই যথাযথ পদ্ধতি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
এদিকে, নোয়াপাড়া বাজারের ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে চুরির মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে গণপিটুনি বা শারীরিক নির্যাতনের পরিবর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অভিযুক্তকে তুলে দেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় ইবাদতকে শাস্তি হিসেবে প্রয়োগ করা কতটা যথাযথ—সেটি নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা মতামত।
তবে ঘটনাটি নিয়ে আইনগতভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা আটক যুবককে পরবর্তীতে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল কি না—এ বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যায়নি।






