ফ্লোরিডার আরেক লাশ উদ্ধার- বৃষ্টির কিনা জানতে ময়নাতদন্ত চলছে
ফ্লোরিডার পিনেলাস কাউন্টির জলাধারে আরও একটি মানবদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারনা করা হচ্ছে এটি বৃষ্টির মরদেহ। পরিচয় নির্ধারণে ময়নাতদন্ত চলছে। বৃষ্টি কিনা নিশ্চিত হতে পারছে না কাউন্টি পুলিশ।
২৬ এপ্রিল রবিবার রাত ৮টা ৪৩ মিনিটে হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। পিনেলাস কাউন্টির ইন্টারস্টেট ২৭৫ ও ফোর্থ স্ট্রিট নর্থের কাছের জলাধার থেকে মানবদেহের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় ও পিনেলাস কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় যৌথভাবে এই উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে। দেহটি এখন পিনেলাস কাউন্টির মেডিকেল এক্সামিনারের দফতরে রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ইতিবাচকভাবে পরিচয় নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
গত সপ্তাহে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার বাংলাদেশি ডক্টরাল শিক্ষার্থী জামিল লিমনের মরদেহ হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতু থেকে উদ্ধারের পর তার রুমমেট হিশাম সালেহ আবুগারবিয়েহকে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। জামিলের মৃত্যু হত্যাকাণ্ড হিসেবে নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু অপর নিখোঁজ শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির দেহ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া যায়নি।
আজকের উদ্ধার স্থানটি তাৎপর্যপূর্ণ। ইন্টারস্টেট ২৭৫ হলো সেই মূল সেতু করিডোর যা টাম্পা থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ ও পিনেলাস কাউন্টিকে সংযুক্ত করে — এবং হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতুর সঙ্গে নিকটবর্তী। জামিলের ফোনের লোকেশন তথ্য এবং আবুগারবিয়েহর গাড়ির গতিবিধির সঙ্গে এই এলাকার সংযোগ তদন্তকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে এটি একটি সক্রিয় তদন্তের অংশ এবং পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অফিস পরবর্তী আপডেট জানাবে। তবে আনুষ্ঠানিক পরিচয় নির্ধারণের আগে কোনো নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।
বাংলাদেশ দূতাবাস, উভয় পরিবার এবং নিউইয়র্ক থেকে ফ্লোরিডা পর্যন্ত বাংলাদেশি সম্প্রদায় এই মুহূর্তে উত্তরের অপেক্ষায়। জামিল ও বৃষ্টির দুই পরিবারসহ স্বজন, স্বদেশিরা দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছেন। পিনেলাস কাউন্টির মেডিকেল এক্সামিনারের দফতর যত দ্রুত সম্ভব পরিচয় নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকালে জামিল ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার পরদিন থেকেই তদন্তকারীরা আবুগারবিয়েহর দিকে দৃষ্টি দেন। ১৭ এপ্রিল জামিলের বন্ধু তাকে তার অ্যাভালন হাইটস অ্যাপার্টমেন্টে খুঁজতে গেলে রুমমেট জানান তিনি কোথায় তা জানেন না এবং জামিলের স্কুটার এখনো অ্যাপার্টমেন্টেই আছে। বৃষ্টির বন্ধু জানিয়েছেন, ১৬ এপ্রিল দুপুর ১১টা ৩০ মিনিটে এবং আবার দুপুর ২টা ১৪ মিনিটে বৃষ্টির সঙ্গে তার কথা হয়েছিল — দ্বিতীয়বার বৃষ্টি তার চশমা নিয়ে আসতে বলেছিলেন। বিকেল ৫টায় বন্ধু অপেক্ষা করেছিলেন কিন্তু বৃষ্টি আর আসেননি।
বৃষ্টির আইপ্যাডে পাওয়া ফেসবুক মেসেঞ্জার কথোপকথনে দেখা যায়, তিনি ও জামিল লোকেশন শেয়ার করছিলেন। দুপুর ১২টা ৪১ মিনিটে বৃষ্টি জামিলকে ফোন করেছিলেন। বিকেল ২টা ৩৯ মিনিটে বৃষ্টির অ্যাকাউন্ট থেকে জামিলকে একটি বার্তা পাঠানো হয় — ভাষা ও প্রসঙ্গ নিশ্চিত হয়নি। এরপর ২টা ৪২ মিনিটে ও ২টা ৫২ মিনিটে আরও দুটি কল হয়।
ইউএসএফ ক্যাম্পাসের সিসিটিভিতে দেখা গেছে, বৃষ্টি দুপুর ১২টা ০৮ মিনিটে তার অফিস বিল্ডিং থেকে বের হচ্ছেন। ১২টা ০৯ মিনিটে তিনি রোদ ঠেকাতে ছাতা মাথায় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পরে জামিলের ঘরে তার পরনের সেই জুতা ও ছাতা পাওয়া গেছে — যা ইঙ্গিত করে বৃষ্টি সেদিন জামিলের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন।
জামিলের ফোনের লোকেশন ট্র্যাকিং দেখায়, বিকেল ৪টা থেকে ৬টার মধ্যে ডিভাইসটি তার স্কুল বা বাসস্থানের কাছে ছিল। রাত ৭টা ৪৩ মিনিটে কোর্টনি ক্যাম্পবেল সেতুর দিকে সরে যায় এবং রাত ৮টা ২৫ মিনিটের পর ক্লিয়ারওয়াটারে অবস্থান দেখায়। এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেছে, আবুগারবিয়েহর সাদা হুন্দাই জেনেসিস জি৮০ গাড়িটি রাত ৭টা ৫৩ মিনিটে কোর্টনি ক্যাম্পবেল সেতুতে ছিল — অর্থাৎ জামিলের ফোনের শেষ পিংয়ের মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে।
আবুগারবিয়েহর বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে কাটার চিহ্ন দেখে গোয়েন্দারা জিজ্ঞেস করলে সে বলে পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে লেগেছে। জিজ্ঞাসায় সে বলতে পারেনি কী রান্না করছিল। পরে দেখা যায় তার বাম বাহুর উপরেও একটি নতুন ক্ষত রয়েছে যা ব্যান্ড-এইড দিয়ে ঢাকা ছিল।
অ্যাপার্টমেন্টের সামনের ডাস্টবিন থেকে ১৬ এপ্রিল রাত ১০টা ৪৭ মিনিটের সিভিএস রসিদ পাওয়া যায় — যেখানে ট্র্যাশ ব্যাগ, লাইসোল ওয়াইপস, ফেব্রিজ, ফানিয়ানস ও আইরিশ বডি ওয়াশের উল্লেখ আছে। ডাক্টটেপের টুকরা পাওয়া গেছে যার ভেতরে সাদা টিস্যু ও রক্তের দাগ। রুমমেট জানান, এই জিনিসপত্র আবুগারবিয়েহ ডেলিভারি দিয়েছিল। কিন্তু আবুগারবিয়েহ দাবি করে সে এগুলো কেনেনি।
কম্প্যাক্টর ডাস্টবিন তল্লাশিতে পাওয়া যায় রক্তমাখা কালো কুশন কিচেন ফ্লোর ম্যাট, রান্নার হাঁড়ি-পাতিল, জামিলের ইউএসএফ আইডি, ক্রেডিট কার্ড ও মানিব্যাগ, ছেঁড়া ও রক্তমাখা ধূসর টিশার্ট, রক্তমাখা ধূসর শর্টস, রক্তমাখা তিন জোড়া মোজা, রক্তমাখা স্যান্ডেল, জামিলের চশমা এবং বৃষ্টির হালকা গোলাপি রঙের আইফোন কভার। ফরেনসিক পরীক্ষায় কালো ম্যাটের ডিএনএ বৃষ্টির সঙ্গে মিলেছে এবং ধূসর টিশার্টের ডিএনএ জামিলের সঙ্গে মিলেছে।
অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে রান্নাঘর থেকে আবুগারবিয়েহর ঘরের দিকে করিডরে রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘরের কার্পেটে মানবাকৃতির দুটি স্পষ্ট রক্তের ছাপ পাওয়া গেছে যা মাটিতে মানুষের আকারের ছিল এবং স্মিয়ারিং ও ড্র্যাগিংয়ের প্যাটার্ন স্পষ্ট। খাটের নিচে ভারী কালো ট্র্যাশ ব্যাগের তিনটি রোল পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে আবুগারবিয়েহর ফোন থেকে। সে ৭ এপ্রিল অ্যামাজন থেকে ডাক্টটেপ অর্ডার করেছিল। ১১ এপ্রিল ফায়ার স্টার্টার, চারকোল, ট্র্যাশ ব্যাগ ও লাইটার ফুয়েল অর্ডার করেছিল। ১৫ এপ্রিল — অর্থাৎ হত্যার একদিন আগে — একটি নকল দাড়ি অর্ডার করেছিল। ১৩ এপ্রিল সে চ্যাটজিপিটিতে জিজ্ঞেস করেছিল, “একজন মানুষকে কালো ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী হয়।” চ্যাটজিপিটি উত্তর দিয়েছিল এটি বিপজ্জনক শোনাচ্ছে। তখন আবুগারবিয়েহ লিখেছিল, “তারা কীভাবে জানবে।” পরের দিনগুলোতে সে জিজ্ঞেস করেছিল গাড়ির ভিআইএন নম্বর বদলানো যায় কিনা, লাইসেন্স ছাড়া বাড়িতে বন্দুক রাখা যায় কিনা, স্নাইপারের গুলিতে মাথায় লাগলে কেউ বাঁচে কিনা, প্রতিবেশীরা গুলির শব্দ শুনতে পাবে কিনা। ১৭ এপ্রিল রাত ১২টা ২৬ মিনিটে — অর্থাৎ হত্যার পর — সে চ্যাটজিপিটিতে জিজ্ঞেস করে “হিলসবোরো রিভার স্টেট পার্কে গাড়ি চেক করা হয় কিনা।”
এরপর ফোনের লোকেশন দেখায়, রাত ১টা ০৪ মিনিটে সে অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বের হয়। রাত ১টা ৩০ মিনিটে হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতুতে থামে। ১টা ৩৫ মিনিটে পশ্চিমে যায়, রুজভেল্ট বুলেভার্ডে ঘুরে আসে। ১টা ৪৬ মিনিটে সেতুর পূর্বমুখী দিকে থামে, ১টা ৪৯ মিনিটে আবার চলতে শুরু করে। রাত ২টা ০৯ মিনিটে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসে।
২৪ এপ্রিল সেতুতে তল্লাশিতে একটি ভারী কালো ট্র্যাশ ব্যাগ পাওয়া যায় যা থেকে পচনের গন্ধ আসছিল। ব্যাগটি আবুগারবিয়েহর ঘরে পাওয়া ব্যাগের অনুরূপ। ভেতরে পাওয়া যায় জামিল লিমনের মানবদেহের অবশিষ্টাংশ — উন্নত পচন পর্যায়ে। পরীক্ষায় পরিচয় নিশ্চিত হয়। মৃত্যুর কারণ “একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাত” এবং মৃত্যু হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত।
এই মামলায় আরও আপডেটের জন্য সঙ্গেই থাকুন।






