‘ধান ডুবি গেলে আমরা বাঁচমু কিলা’
‘হাওরের বোরো ধানই আমরার একমাত্র জীবন চলার ভরসা। হারা (সারা) বছরের খানি (খাবার) চলে অউ ধান থাকি। হুনরাম, আগাম বন্যা বলে অইব। যদি বন্যায় ফসল ডুবি যায় বা নষ্ট অই যায় তাহলে আমরা বাঁচমু কিলা। অভাব অনটনে খাইয়া না খাইয়া হারাবছর থাকতাম অইব। জীবন বাঁচাতে স্বামীর লগে হাওরের পাকা ধান গোলায় তুলতে কাজ কররাম।’
আজ রোববার দুপুরে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়া হাওরের দাসনাগাঁও স্লুইসগেট এলাকায় এসব কথা বলছিলেন কৃষানি রুনা বেগম (৩০)। তার বাড়ি হাওরের পার্শ্ববর্তী দিরাই উপজেলার রাজনগর গ্রামে।
তিনি হাওর থেকে জমির কাটা ধান নৌকায় বোঝাই করে তীরে এনে নৌকা থেকে ধান তুলছিলেন পাড়ে। তাকে সহযোগিতা করছেন আরেক নারী।
রুনা বেগম এ প্রতিবেদককে জানালেন, এবার হাওরে শ্রমিক সংকট, ক্ষেতে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় ধান কাটার মেশিন (হারভেস্টার) দিয়ে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। পাকা ধান নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন। আজকে সকালে গ্রামের এক যুবককে নিয়ে তাঁর স্বামী শাহেদ মিয়া জমির ধান কাটছেন। আর ওই কাটা ধান তিনি নৌকা করে এনে পারে তুলছেন। পরে এখানেই মাড়াই কাজ শেষে বাড়িতে নিয়ে যাবেন।
নলুয়ার হাওরে এ বছর ৫ কেদার জমিতে ফসল চাষাবাদ করেছেন এই কৃষক পরিবার। ৫ সদস্যের সংসারে সারা বছরের সংসারের জোগান চলে এই ফসল থেকে। ওই নারীর মতো পাকা ধান ঘরে তুলতে লড়ছেন কৃষকরা।
জেলার অন্যতম বৃহৎ নলুয়া হাওরের রসুলপুর এলাকায় কথা হয় আরেক দরিদ্র কৃষক জাহাঙ্গীর মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শ্রমিক সংকটের কারণে ছোট ভাইকে নিয়ে ক্ষেতের পাকাধান কাটছি। দুই-তিন দিনের মধ্যে ধান কাটা শেষ করতে পারব। এ বছর ৪ কেদার জমিতে বোরো ফসল আবাদ করেছি। ভালো ভালোয় যদি ফসল তোলা যায় তাহলে এই কষ্ট সার্থক হবে।’
হাওড়পাড়ের বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, এবার ফসল ভালো হলেও হাওরে নানা সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। হাওরে জলাবদ্ধতা, জ্বালানি সংকট ও শ্রমিক সংকটে দিশেহারা কৃষকরা।
নলুয়া হাওর বেষ্টিত চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, হাওরে এখন ধান তোলার কাজে ব্যস্ত কৃষক-কৃষাণিরা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করছেন তারা। আগাম বন্যার শঙ্কায় উৎকষ্ঠাও আছে।
এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ড অকাল বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দ্রুত ধান কাটার জন্য আহ্বান জানালে কৃষকদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্র জানায়, জগন্নাথপুরে এ বছর ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৫০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে।
জগন্নাথপুর জলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমদ বলেন, হাওরে কিছুটা শ্রমিক সংকট রয়েছে। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যে ধান কাটা শেষ হবে।







