শিশুর খাবারে রাখতে পারেন রঙিন শাকসবজি-ফলমূল
মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে প্রথম বা প্রধান হলো খাদ্য। মানুষ খাদ্য গ্রহণ না করলে বাঁচা সম্ভব নয়। বয়সভেদে মানুষের খাবারের চাহিদা একেক রকম। যেমন শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের খাবার এক নয়। রুচি বা পছন্দও এক নয়। নবজাতকরা শুধু মায়ের দুধ পান করে। তারপর একটু বড় হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি ভাত-মাছসহ, ডিম এবং রঙিন ফল যেমন কলা, পেঁপে, আম এসব খাবারও দিতে হয়।
শিশুদের শুধু জন্মের পর রঙিন শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ালে চলবে না। খাওয়াতে হবে শিশু জন্মের আগে গর্ভবতী মাকেও। গর্ভবতী বা প্রসূতি মায়েদের রঙিন শাকসবজি ও ফলমূল একটু বেশি পরিমাণেই খেতে হয়। যেমন লালশাক, কচুশাক, পুঁইশাক, লাউশাক, পালংশাক, আম, কলা, পেঁপে, গাজর, বেদানা, মিষ্টি কুমড়া, করলা, চিচিঙা, বরবটি ইত্যাদি। শাকের মধ্যে অন্যতম লালশাক। কেননা এই শাকে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ অন্যান্য শাকের চেয়ে তুলনামূলক বেশি।
শিশুর সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সুষম খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। কিছু খাবার আছে যেগুলো খেলে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ইত্যাদির ঘাটতি পূরণ হয় অথচ বর্তমানে অনেক শিশুই ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। এর ফলে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। তাই শিশুর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রঙিন শাকসবজি ও ফলমূল রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
রঙিন শাকসবজি ও ফলমূল শুধু খাবারের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এগুলো বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদানেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সবুজ শাক, লাল টমেটো, কমলা গাজর, বেগুনি বাঁধাকপি, হলুদ কুমড়া কিংবা নানা রঙের ফল প্রতিটি রংই ভিন্ন ভিন্ন পুষ্টিগুণের বার্তা বহন করে। এসব খাবারে থাকা ভিটামিন এ, সি, ই, ফোলেট বা ভিটামিন বি৯, পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে এবং সুস্থ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
৫ অভ্যাসে বাড়তে পারে লিভারের সমস্যা
সবুজ শাকসবজিতে রয়েছে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ফলিক অ্যাসিড, যা রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ এবং হাড় মজবুত রাখতে সহায়ক। গাজর, কুমড়া ও পেঁপের মতো কমলা রঙের খাবারে থাকা বিটা-ক্যারোটিন চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে তরমুজ, টমেটো ও লাল ক্যাপসিকামে থাকা লাইকোপিন শরীরের কোষকে সুরক্ষা দেয়। বেগুনি বা নীলচে ফলমূল, যেমন আঙুর বা জামে থাকা অ্যান্থোসায়ানিন মস্তিষ্কের বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সাহায্য করে।
শিশুকে জোর করে খাবার খাওয়ানোর পরিবর্তে খাবারকে আকর্ষণীয় করে পরিবেশন করা যেতে পারে। বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজি দিয়ে প্লেট সাজানো, মজার আকৃতিতে কেটে পরিবেশন করা কিংবা স্যুপ, সালাদ, স্যান্ডউইচ বা স্মুদিতে যুক্ত করলে শিশু সহজেই এসব খাবারের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
পরিবারের অন্য সদস্যরাও নিয়মিত ফল ও শাকসবজি খেলে শিশুর মধ্যে ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে ওঠে। তবে শুধু রঙিন হলেই হবে না, খাবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফল ও শাকসবজি ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে পরিবেশন করতে হবে। ফল নষ্ট কিংবা পোকায় ধরা নাকি সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। শিশুর খাবারের জন্য মৌসুমি ও তাজা ফলমূল বেছে নেওয়া উচিত। অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা কৃত্রিম রং মেশানো খাবারের পরিবর্তে প্রাকৃতিক খাবারই শিশুর জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রতিদিন বিভিন্ন রঙের শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস শিশুর পুষ্টির ঘাটতি কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। তাই শিশুর খাদ্যতালিকায় যত বেশি প্রাকৃতিক রঙের সমাহার থাকবে, তার সুস্থ ও প্রাণবন্তভাবে বেড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তত বেশি হবে।
আমাদের দেশে সব ঋতুতেই ভিটামিন সমৃদ্ধ রঙিন শাকসবজি ও ফলমূল পাওয়া যায়। কিছু দেশি ফল আছে, যা বিদেশি দামি ফলের চেয়ে বেশি উপকারী। রঙিন পুষ্টিকর শাকসবজি ও ফলমূল শুধু শিশুর খাবারের বৈচিত্র্যই বাড়ায় না, বরং একটি সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম ভিত্তিও তৈরি করে। তাই আজ থেকেই শিশুর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকুক রঙিন শাকসবজি ও ফলমূল।







