সিলেটে তীব্র লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ জনজীবন
প্রচন্ড গরমের মধ্যে সিলেটে বিদ্যুৎ সংকট আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দিন-রাত সমানতালে চলছে লোডশেডিং। নগরীর কোথাও এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, কোথাও টানা এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পরিস্থিতি আরও নাজুক। উপজেলাগুলোতে কোনো কোনো এলাকায় টানা প্রায় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে পিডিবির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২৬৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে ২১৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৫০ মেগাওয়াট। রাতের পিক আওয়ারে সিলেটে প্রায় ২৬ শতাংশ লোডশেডিং করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির আরও খারাপ চিত্র পাওয়া গেছে রাতের পিক আওয়ারের জোনভিত্তিক হিসাবেও। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, পিক আওয়ারে ২১ ঘন্টার হিসাবে সিলেট জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৮২৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে লোডশেডিং দেখানো হয়েছে ২১৮ মেগাওয়াট।
চাহিদা থেকে লোডশেডিং বাদ দিলে হিসাব অনুযায়ী ওই সময়ে সরবরাহ দাঁড়ায় প্রায় ৬১০
মেগাওয়াট। ফলে সিলেট জোনের মোট চাহিদার ২৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ লোডশেডিংয়ের আওতায় ছিল। বিপরীতে চাহিদার ৭৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ পিক আওয়ারে সিলেটের প্রতি ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে প্রায় ২৬ মেগাওয়াট সরবরাহের বাইরে ছিল।
সাত দিনে ছয় দিনই ঘাটতি:
বিদ্যুৎ সরবরাহের দৈনিক হিসাবেও সংকটের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। ৩ আগস্ট ১৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১১০ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৬০ মেগাওয়াট, যা সাতদিনের মধ্যে সর্বোচ্চ।
৪ আগস্ট চাহিদা ছিল ১৭০ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১২০ মেগাওয়াট। ঘাটতি ৫০ মেগাওয়াট।
৫ আগস্ট ১১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পুরো ১১০ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়া যায়। সাত দিনের মধ্যে এদিনই কেবল চাহিদা পূরণ হয়েছিল। এরপর ৬ আগস্ট ১৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২০ মেগাওয়াট। ঘাটতি ৩৫ মেগাওয়াট। ৭ আগস্ট ১৪৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ১০০ মেগাওয়াট, ঘাটতি ৪৫ মেগাওয়াট। ৮ আগস্ট ১৫০ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ১০৫ মেগাওয়াট, ঘাটতিও ৪৫ মেগাওয়াট। ৯ আগস্ট ১৪৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১১৬ মেগাওয়াট। ঘাটতি ২৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সাত দিনের ছয় দিনই চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পেয়েছে সিলেট। সবচেয়ে বড় ঘাটতি ছিল ৩ আগস্ট। আর ৭আগস্ট চাহিদার প্রায় ৩১ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ কম ছিল। গ্রাহকদের অভিযোগ, পূর্বঘোষণা ছাড়াই লোডশেডিং হওয়ায় বিপাকে পড়ছেন। নগরবাসী।
নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক এলাকায় দিনে ও রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কখনো এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর পরের ঘণ্টাতেই আবার চলে যাচ্ছে। কোথাও আবার টানা এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
লোডশেডিং শুধু ঘরবাড়ির ভোগান্তি বাড়াচ্ছে না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নগরীর ব্যবসা-বাণিজ্যও কর্মক্ষেত্রে। বিদ্যুৎনির্ভর দোকান, কম্পিউটার ও প্রিন্টিং ব্যবসা, অনলাইন সেবা, অফিস এবং বিভিন্ন ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসায় বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ কখন যাবে বা কখন আসবে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস না থাকায় কাজের পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জিন্দাবাজারের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মী সোহেল আহমদ বলেন, “অফিস সময়ের আট ঘণ্টার মধ্যে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। এক ঘণ্টা থাকলে পরের ঘণ্টায় থাকে না। এতে ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে।”
হাউজিং এস্টেট এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, “গত রাতে ১২টার দিকে ছোট সন্তানকে নিয়ে ঘুমাতে যাওয়ার পরই বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রায় এক ঘণ্টা পর আসে। এই সময়টাতে ছোট শিশুকে নিয়ে খুব কষ্ট করতে হয়েছে।”
জিন্দাবাজারের রাজাম্যানশন লাইব্রেরির ব্যবসায়ী মাসুম আহমদ বলেন, “কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই গভীর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের যাচ্ছেতাই অবস্থার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।”
আগেও ছিল সংকট: সিলেটে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি নতুন নয়। গত এক বছর ধরেই বিভিন্ন সময়ে চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ভোগান্তি বাড়ে।
চলতি বছরের এপ্রিলেও সিলেটে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছিল। তখন চাহিদার তুলনায় সরবরাহে প্রায় ৩৫ শতাংশ ঘাটতি ছিল এবং প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হয়েছিল। সে সময় বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে জাতীয় গ্রিড থেকে কম সরবরাহ, জ্বালানি সংকট ও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটিকে সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। জুনেও সংকট অব্যাহত ছিল। ওই সময় সন্ধ্যা পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২৩২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১৪৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৮৪ মেগাওয়াট, যা ওই সময়ের চাহিদার প্রায় ৩৬ দশমিক ২১ শতাংশ।
জাতীয় গ্রিড থেকে কম সরবরাহের কথা বলছে পিডিবি: সিলেটে লোডশেডিংয়ের কারণ সম্পর্কে বিপিডিবি সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. ইমাম হোসেন বলেন, “জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়ার কারণে সিলেটে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।” লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট সময়সূচি আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এরকম কোনো সময়সূচি নেই।”একই এলাকায় বারবার লোডশেডিং হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটি রোটেশনভিত্তিক লোড ব্যবস্থাপনার অংশ।” পরিস্থিতি কত দিন চলতে পারেএ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, “আগামী কয়েক দিন এ পরিস্থিতি চলমান থাকবে কি না, তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বাড়লে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।” তবে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কখন বাড়বে কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের এই পরিস্থিতি কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারেননি তিনি।
ফলে একদিকে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা, অন্যদিকে সরবরাহে ঘাটতি-এইদুইয়ের চাপে সিলেটের গ্রাহকদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং। গ্রাহকদের দাবি, সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি কোন এলাকায় কখন কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকবে বা থাকবে না-সে বিষয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সময়সূচি প্রকাশ করা হোক।







