সহকর্মীদের বেতন জোগাতে নৌকা চালান প্রধান শিক্ষক
বান্দরবানের অতি দুর্গম পাহাড়ঘেরা থানচির তিন্দু এলাকা। যেখানে অধিকাংশই নিম্ন আয়ের প্রান্তিক মানুষ। প্রতিকূল পরিবেশেও এই এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়। স্কুলটির পরিচালনা ও অন্য সহকর্মীদের বেতন জোগাতে নিজেই ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালান বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে এলাকার কিছু শিক্ষানুরাগীর প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যালয়টি। ওই বছরই প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন বামং খিয়াং মিংলেন। তিনি কক্সবাজার সিটি কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এমবিএ ও পরে কক্সবাজার টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৬ জন শিক্ষক অল্প বেতনে নিয়মিত পাঠদান করছেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষার মাধ্যমে ৮ জন শিক্ষক ও ৫ জন কর্মচারী নিয়োগের সুযোগ থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে ২ জন শিক্ষক অবৈতনিকভাবে রাখা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদেরও বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন জানান, বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় নিয়মিত বেতন আদায় সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়া প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় থানচি উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে প্রতি শুক্রবার, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিনে থানচি থেকে তিন্দু বড় পাথর, রেমাক্রী ফলস রুটে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, অন্য চালক রাখলে আলাদা মজুরি দিতে হয়, চালক অনেক সময় আয়ের টাকা গোপন রাখে। সেজন্য তিনি নিজেই চালক হিসেবে কাজ করায় টাকা বাঁচে, যা দিয়ে শিক্ষকদের বেতন দিতে পারেন।
গত মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এই বোট দিয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করে ৪৯ হাজার ১০০ টাকা আয় হয়েছে। এরমধ্যে ৩০ হাজার টাকা শিক্ষকদের বেতন-ভাতা হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে জানান বামং খিয়াং মিংলেন। শুধু শিক্ষকদের বেতন জোগানই নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়া ও সাঙ্গু নদী পারাপারেও নিজেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ৫৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। চলতি বছর নবম শ্রেণি চালু করা হয়েছে। তবে হোস্টেলে খাবার জোগান দেওয়া গেলে শিক্ষার্থী সংখ্যা আরও বাড়বে বলে জানান প্রধান শিক্ষক।
বিদ্যালয়টি ২০২১ সালে স্থাপনের অনুমোদন পায় ও ২০২৩ সালে নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের স্বীকৃতি লাভ করে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে পাঠদানের অনুমতি দিয়েছে। বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং।
তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মংপ্রু অং মারমা বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান থাকাকালে ইউনিয়নের টোল-ট্যাক্সের অর্থ বিদ্যালয় তহবিলে দিয়ে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হতো। বর্তমানে উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া নৌকার আয় থেকেই বিদ্যালয়টি কোনোমতে চলমান রয়েছে।’
থানচি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াই হ্লা মং মারমা বলেন, ‘দুর্গম প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে উচ্চবিদ্যালয় থাকা উচিত বিবেচনায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলাম। এখন তেমন ভূমিকা রাখতে পারছি না।’
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, ‘দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই দরিদ্র হওয়ায় বিদ্যালয়ের নিয়মিত আয় নেই। তাই টেকসই সমাধান হিসেবে তিন্দু ও রেমাক্রি এলাকায় দুটি বিদ্যালয়কে দুটি ইঞ্জিনচালিত বোট দেওয়া হয়েছিল, যাতে পর্যটক পরিবহন করে যা আয় হয় তা দিয়ে শিক্ষকদের ন্যূনতম বেতন দেওয়া যায়।’
তিনি আরও জানান, বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস সংস্কার করা হয়েছে ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ভবন নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকেও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে উপজেলা পরিষদ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।







