দুইশ বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী জমিদারবাড়ি
চলনবিলের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় দুইশ বছরের এক নীরব সাক্ষী শীতলাই জমিদারবাড়ি। পাবনার চাটমোহর উপজেলার নিমাইচড়া ইউনিয়নের শীতলাই গ্রামে ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে গড়া এই ভবনটি একসময় ছিল জমিদার যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রের প্রতাপ ও ঐশ্বর্যের প্রতীক। আজ তা পরিণত হয়েছে ভগ্নস্তূপে, যেখানে দেয়াল থেকে খসে পড়ছে ইট-চুন-সুরকি, ফাটল ধরেছে প্রতিটি কোণে, আর আগাছায় ঢেকে গেছে ছাদ থেকে উঠান পর্যন্ত। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন মাদকসেবীদের নিরাপদ ঠিকানা, কারও কারও মুখে ফিরছে ‘ভূতের বাড়ি’ নামেও।
ইতিহাসবিদ অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল হামিদের চলনবিলের ইতিকথা গ্রন্থ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে পাঠান আমলে শীতল খাঁ নামের এক ব্যক্তি হান্ডিয়াল ও সমাজ গ্রামের মাঝামাঝি এলাকায় এই জনপদের পত্তন করেন। তার নাম থেকেই গ্রামটির নাম হয় শীতলাই। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে যোগেন্দ্রনাথ মৈত্র সিরাজগঞ্জের শরৎনগর থেকে জমিদারি স্থানান্তর করে শীতলাইয়ে গড়ে তোলেন এই বিশাল জমিদারবাড়ি। ৩০ কক্ষবিশিষ্ট দোতলা ভবন, পাশে ঘোড়াশাল আর শান বাঁধানো ঘাটওয়ালা বিশাল দিঘি—সব মিলিয়ে এক জমকালো জমিদারি চিত্র। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শীতলাই উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়, খনন করেন একাধিক পুকুর। খাল সংস্কার করেন। দুর্ভিক্ষের সময় (বাংলা ১৩৩৮ ও ১৩৫০ সাল) লঙ্গরখানা খুলে মানুষের পাশে দাঁড়ান। পাবনায় তার উদ্যোগে গড়ে ওঠে গান্ধী উচ্চবিদ্যালয় (বর্তমান সেন্ট্রাল গার্লস হাই স্কুল), দাতব্য চিকিৎসালয় ও ডাকঘর।
তবে ইতিহাসের এই অধ্যায় নিষ্কলুষ নয়। তার আমলে মুসলিম প্রজাদের ওপর ধর্মীয় নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে, গরু কোরবানি নিষিদ্ধ করা হয়—যার প্রতিবাদে মাওলানা রুহুল আমীন ও কামাল উদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ প্রায় এক সপ্তাহ জমিদার বাড়ি ঘেরাও করে রাখে। শেষে ফুরফুরে শরীফের পীর আবু বকর সিদ্দিকীর মধ্যস্থতায় মীমাংসা হয়। এরপর যোগেন্দ্রনাথ মৈত্র স্থায়ীভাবে পাবনা শহরে নির্মিত শীতলাই হাউসে বসবাস শুরু করেন। বাংলা ১৩৬৯ সালে তার মৃত্যু হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, একসময়ের সেই জৌলুসপূর্ণ ভবন আজ কঙ্কালসার। সিদ্ধিনগর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মোতালেব হোসেন জানান, বছর কয়েক আগেও ভবনের দরজা-জানালা অক্ষত ছিল। কিন্তু সরকারি তত্ত্বাবধানের অভাবে স্থানীয় প্রভাবশালীরা ধাপে ধাপে খুলে নিয়ে গেছে দরজা, জানালা—এমনকি দেয়ালের ইট-বালুও।
হান্ডিয়ালের বাসিন্দা আব্দুল হান্নান খোকনের ভাষ্যে, দেশভাগের পর মৈত্র পরিবার ভারতে চলে গেলে রেখে যাওয়া সম্পত্তির একটি বড় অংশ চলে যায় ভূমিদস্যুদের কবজায়। তার মতে, সংস্কার হলে এটি হয়ে উঠতে পারে চলনবিলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।
শিক্ষানুরাগী আবু ছালেক দখলদারদের কবল থেকে ভবনটি উদ্ধার করে সেখানে চলনবিল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। হান্ডিয়াল পাকপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আজিজ ও শিক্ষক রফিকুল ইসলাম রনিও একই সুরে বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশের বৃহত্তম বিল চলনবিলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই স্থাপনা হতে পারে অনন্য এক পর্যটন গন্তব্য। রনির আক্ষেপ, ইতিহাসের সাক্ষী হয়েও এই ভবনটি এখনো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটভুক্ত হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও বগুড়া অঞ্চলের পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান বলেন, ভবনটি গেজেটভুক্ত হয়েছে কি না, তা তার জানা নেই, তবে খোঁজখবর নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুইশ বছরের ইতিহাস, একাধিক প্রজন্মের উত্থান-পতন আর জনহিতৈষী কর্মকাণ্ডের সাক্ষী শীতলাই জমিদারবাড়ি সময়মতো সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে চলনবিলের এই ঐতিহাসিক নিদর্শন হয়তো একদিন চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে।







