মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া রেলপথ যেন মরণফাঁদ
মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া আখাউড়া-সিলেট রেলপথ এখন যাত্রীদের কাছে আতঙ্কের এক নাম। পাঁচ কিলোমিটারের এই আকাঁবাঁকা রেলপেথে ট্রেন বিকল হওয়া বা লাইনচ্যুত হওয়া যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
গত ১ অক্টোবর রাতে আন্তনগর কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল ও পরদিন ২ অক্টোবর দুপুরে চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের হুক ছিড়ে ৯টি বগি রেললাইনে থেকে বনের ভেতর চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে গত ৮ মাসে অন্তত ২০ বার ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে লাউয়াছড়া বনে আটকা পড়েছে। বারবার ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ফলে যেমন সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন, তেমনি হচ্ছে সিডিউল বিপর্যয়।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৮৯৮ সালে আসাম ও চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের জন্য সিলেট-আখাউড়া হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন করা হয়। সেই সময়ের রেললাইন এখনও বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট অভিমুখে এই রেললাইনে প্রতিদিন ৬টি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী চলাচল করে থাকেন।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায় রেললাইন সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, সিলেট-আখাউড়া সেকশনের শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন থেকে ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী ৫-৬ কিলোমিটার রেললাইন লাউয়াছড়া বনের ভেতরে। পুরোনো এই রেললাইনে স্লিপারের ক্লিপ, নাট বল্টু বেশিরভাগই নেই। কিছু কিছু জায়গায় ক্লিপ নড়বড়ে থাকায় শুধুমাত্র নামমাত্র ঝালাই দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় নাটের মধ্যে তার দিয়ে পেছিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে বনের ভেতরে রেললাইনটুকু অত্যন্ত ঝুকিঁপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
রেলওয়ের এক তথ্য অনুযায়ী, রেলওয়ের বিভিন্ন লাইনে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে চলিত অক্টোবর মাস পর্যন্ত অন্তত শতাধিক বার ট্রেনের ইঞ্জিল বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ সিলেট- আখাউড়া সেকশেন ঘটেছে। শুধুমাত্র লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরেই অন্তত ২০ বার ইঞ্জিন বিকল ও ট্রেনের বগি বিচ্ছিন্নের ঘটনা ঘটেছে।
তথ্য অনুয়ায়ী, গত ১ অক্টোবর রাতে কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ১ ঘণ্টা ও ২ অক্টোবর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি আপ উঠতে না পেরে হুক ছিড়ে ৯টি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে ৩ ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। এর আগে ইঞ্জিন বিকল হয়ে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেন ৫ ঘণ্টা, ১ মার্চ সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেস রাতের বেলা ৫ ঘণ্টা, ৭ মার্চ রাতের বেলা সিলেটগামী কালনী এক্সপ্রেস ট্রেন দেড় ঘণ্টা, ১৯ মার্চ সিলেটগামী কালনী এক্সপ্রেস ট্রেন দুই ঘণ্টা, ১ এপ্রিল সিলেটগামী কালনী এক্সপ্রেস ট্রেন ৫ ঘণ্টা আটকে ছিল। ২৯ মে বিকেলে লাউয়াছড়ায় তেলবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এখন লাউয়াছড়ার বনের নির্জন জায়গায় রাতে ট্রেনগুলো বিকল হয়ে আটকা পড়ার আতঙ্কে থাকেন যাত্রীরা।
শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা যায়, ভালো ইঞ্জিন যখন এ রুটে দেওয়া হয় তখন পাহাড়ি উচু টিলা বেয়ে ট্রেন চলতে সক্ষম হয়। পুরাতন ইঞ্জিন নিয়ে প্রায় ট্রেন চলতে বিলম্ব হয়। যে ইঞ্জিন ঢাকা হতে সিলেট আসে একই ট্রেন একই ইঞ্জিন নিয়ে আবার ফিরতে হয়।
কুলাউড়া রেলওয়ের জংশনের একটি সূত্র জানায়, সিলেট রেলপথের লাউয়াছড়া ও মাইজগাও এলাকা কিছুটা পাহাড়ি। তবে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় লাউয়াছড়া বনের অংশে। সেখানে ভাঙা ব্রিজ নামক এলাকায় রেললাইনের ঢাল বেশি হওয়ায় ট্রেনগুলোকে টেনে তোলার জন্য অনেক সময় অতিরিক্ত ইঞ্জিন প্রয়োজন হয়। কিন্তু এ লাইনে বগি বাড়ানো হলেও ইঞ্জিন এর সক্ষমতা সেই অনুপাতে না বাড়ায় বিকল হওয়ার হার কমেছ না। পুরাতন ট্রেন ইঞ্জিন ও রেললাইনের স্লিপার নড়বড়ে হওয়ায় বনের ভিতরে টিলা পারাপার হতে পারে না অনেক ট্রেন। বিশেষ করে উপবন, পাহাড়িকা, কালনি এক্সপ্রেস ট্রেনগুলো এই রুটে যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে বেশি পড়ছে।
একটি সূত্র জানায়, সিলেট রুটে ২৯০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো প্রায় ১৮ থেকে ১৯ বছেরর পুরনো হওয়ায় পাহাড়ি উঁচু পথ টানার ক্ষমতা অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। জীর্ণ রেলপথ আর পুরনো সেতুর কারণেই মূলত রেলপথ থেকে ছিটকে পড়ছে বগি, ইঞ্জিন ও চাকা। আখাউড়া-সিলেট সেকশনের পাহাড়ি ও আঁকাবাঁকা সড়ক হওয়ায় রশিদপুর থেকে মাইজগাঁও পর্যন্ত সবেচয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, লাউয়াছড়া বনের ভেতরের রেলপথটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে বেশি বাঁক এবং পাহাড়ি ঢাল থাকায় ট্রেনের ইঞ্জিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সিলেট রুটে সরবরাহ করা হয়েছে ২৬১০ এবং ২৯০০ সিরিজের মেয়াদোত্তীর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করার মতো পুরনো সব ইঞ্জিন। লাউয়াছড়ার পাহাড়ি পথ বা উঁচুতে ওঠার সময় প্রায়দিনই এসব ইঞ্জিনের প্রেসার কমে বিকল হয়ে যায়। ফলে প্রতিটি ট্রেনের শিডিউল ২ থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বিত হওয়া স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) নির্বাহী কমিটি বাংলাদেশ রেলওয়ের আখাউড়া-সিলেট মিটার গেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজে পরিবর্তন করার লক্ষ্যে ১৬ হাজার ১০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে। কিন্ত সেই প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ কয়েক বছের মাঠপর্যায়ে ১ টাকার কাজও শুরু করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। এদিকে ২০২৫ সাল থেকে সিলেটের রেলপথ সংস্কার, নতুন ট্রেন সংযোগসহ নানা দাবীতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় আট দফা দাবি বাস্তবায়ন আন্দোলন পরিষদের ব্যানারে আন্দোলন চালছে। আট দফা দাবি বাস্তবায়ন আন্দোলন পরিষদের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্টেশনে মানববন্ধন ও ট্রেন অবরোধ করেছেন। রেলওয়ের সচিবসহ রেলওয়ে ঊধ্বর্তন পর্যায়েও বৈঠক হয়েছেন।
কুলাউড়ার আট দফা দাবি বাস্তবায়ন আন্দোলন পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক আজিজুল ইসলাম বলেন, সিলেট বিভাগের রেলপথ আজও সংস্কারবিহীন। নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীগণকে। সিলেট অঞ্চলের রেলপথের বেহাল অবস্থা দূর করতে এবং যাত্রীসেবার মানোন্নয়নের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে কয়েক মাসে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের দায়িত্বে থাকা বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রায় রাতে লাউয়াছড়া বনের রেলগেট হতে মাগুরছড়া নামক এলাকায় ট্রেন আটকা পড়ার খবর পাই। অনেক সময় আমাদের লোকরা সহযোগিতা করে থাকে।
ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার গৌড়প্রসাদ দাস পলাশ বলেন, লাউয়াছড়ার ভাঙা ব্রিজ এলাকায় প্রায়ই রাতে আন্তঃনগর ট্রেন আসা-যাওয়ার পথে ইঞ্জিন বিকল হয়। গত ৮ মাসে অন্তত ২০ বার ট্রেন আটকা পড়েছে। সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর রাতে কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ১ ঘণ্টা ও ২ অক্টোবর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি আপ উঠতে না পেরে হুক ছিড়ে ৯টি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে ৩ ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল।
রেলওয়ের শ্রীমঙ্গলের ঊর্ধ্বতন উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুল্লাহ বলেন, লাউয়াছড়া পাহাড়ি পথ। উঁচু টিলা থাকায় ট্রেন ধীরগতিতে যেতে হয়। আমাদের পক্ষ থেকে সব সময় লাইনে কাজ করা হয়, যাতে কোনো সমস্যা না হয়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানান, চাহিদার তুলনায় সারাদেশে ট্রেনের ইঞ্জিন সংকট রয়েছে। আমরা চেষ্টা করিছ দ্রুত কিভাবে এ সমস্যা সমাধান করা যায়।
এসব সমস্যার বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, নতুন ইঞ্জিনের অভাবে পুরনো ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করায় কাজ ব্যাহত হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে যথাযথ গতি উঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণেই চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিন অকেজো হয়ে পড়ছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত নতুন ইঞ্জিন আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।







