আজ ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দিবস আজ
আজ ঐতিহাসিক ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট)। ২০২৪ সালের এই দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় এনে দেয়। দীর্ঘ ১৭ বছরের শেখ হাসিনার শাসনের অবসান ঘটে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে। দেশজুড়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনের চূড়ান্ত কর্মসূচি ‘মার্চ টু ঢাকা’ একদিন এগিয়ে আনার ঘোষণার পর রাজধানী পরিণত হয় জনসমুদ্রে। আন্দোলনের তীব্র চাপের মুখে দেশ ছেড়ে চলে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় লাখো মানুষের বিজয়োল্লাসে রচিত হয় নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়।
৫ আগস্ট, সোমবার। ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল বাংলাদেশ। আগের দিনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণাই হয়ে ওঠে সরকার পতনের শেষ ধাক্কা। জুলাইজুড়ে প্রাণহানি, সংঘর্ষ ও দমন-পীড়নের পর সেদিন রাজধানীমুখী মানুষের ঢল ছিল যেন বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা এক অপ্রতিরোধ্য গণজোয়ার।
ভোর হওয়ার আগেই ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনী। ব্যারিকেড, কাঁটাতারের বেড়া, সাজোয়া যান এবং সশস্ত্র অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছিল যে, যেকোনো মূল্যে জনস্রোত ঠেকানোর প্রস্তুতি ছিল। সকাল ৭টা পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী, উত্তরা ও রামপুরাসহ আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রগুলো ছিল প্রায় জনশূন্য; চারদিকে বিরাজ করছিল উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা ও থমথমে পরিবেশ।
কিন্তু সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চাঁনখারপুল, নিমতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতা জড়ো হতে শুরু করে। সকাল ১০টার পর নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। গুলি, টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জের মধ্যেও আন্দোলন থামেনি। সেদিন চাঁনখারপুল এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে শহীদ আনাসসহ কয়েকজন প্রাণ হারান। দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও হতাহতের খবর আসে।
মধ্যদুপুরের আগেই রামপুরা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। কারফিউ, ব্যারিকেড এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থান উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করতে থাকেন। জনতার ঢেউ একের পর এক নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের দিকে অগ্রসর হয়। সেদিনের সেই দৃশ্য বাংলাদেশের গণআন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে গণভবন ছাড়ার প্রস্তুতি নেন শেখ হাসিনা। দুপুরের দিকে তিনি দেশ ত্যাগ করেছেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানীতে বিজয়ের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। গণভবন ও সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে হাজারো মানুষ। দীর্ঘ আন্দোলনের পর বিজয়ের অনুভূতিতে রাজপথে নেমে আসে উৎসবমুখর পরিবেশ।
বিকেল পৌনে চারটার কিছু পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তৎকালীন সেনাপ্রধান। তিনি শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
দিনের শেষ প্রহরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বহুল প্রতীক্ষিত সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী জাতীয় সরকারের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তীতে ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।
৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) তাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এই দিনটি গণঅভ্যুত্থান, ত্যাগ, রক্তদান এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।






