চাঁদাবাজির চিঠিতে বরখাস্তের দুই বছর পর হবিগঞ্জে ফিরেই ফের বিতর্ক, আবারও বদলি ওসি কামাল
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক কামালকে প্রায় দুই বছর নয় মাস পর হবিগঞ্জে পদায়ন করা হলে ফের শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। ২০২৩ সালে শায়েস্তাগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ-আরএফএলসহ তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে শারদীয় দুর্গাপূজা ও কমিউনিটি পুলিশিং ডে উপলক্ষে লাখ লাখ টাকার মালামাল চেয়ে লিখিত চিঠি দেওয়ার ঘটনায় তিনি সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন। সম্প্রতি তাকে হবিগঞ্জে পদায়ন নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর আবারও তাকে বদলি করে সুনামগঞ্জ পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ওলিপুরে অবস্থিত দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএলের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কসহ তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কাছে পৃথক তিনটি চিঠি পাঠান তৎকালীন ওসি নাজমুল হক কামাল। তার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে শারদীয় দুর্গাপূজা ও কমিউনিটি পুলিশিং ডে উদযাপনের জন্য প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার মালামাল সরবরাহের অনুরোধ করা হয়।
চিঠিতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে কাচ্চি বিরিয়ানি, জিলাপি, মিষ্টি, দই, পানি ও বিভিন্ন ধরনের ফল বাবদ প্রায় এক লাখ টাকার খরচের হিসাব দেওয়া হয়। এছাড়া কমিউনিটি পুলিশিং ডে উপলক্ষে ব্যানার, ফেস্টুন, মাইকিং এবং ৫০০ মানুষের খাবারের আয়োজন বাবদ আরও আড়াই লাখ টাকার মালামাল চাওয়া হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
এর ছয় দিন পর, ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের আদেশে ওসি নাজমুল হক কামালকে সাময়িক বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
বিভাগীয় মামলার তদন্ত করেন হবিগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের পুলিশ সুপার মাহিদুজ্জামান। মামলার তদন্তে ২০২৫ সালের ২ জুলাই সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেন। এরপর প্রায় দুই বছর নয় মাস পর সম্প্রতি নাজমুল হক কামালকে আবার হবিগঞ্জে পদায়ন করা হলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তাকে হবিগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করে সুনামগঞ্জ পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। নাজমুল হক কামালের – বিভাগীয় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, হবিগঞ্জ ইন-সার্ভিস পুলিশ সুপার মাহিদুজ্জামান জানান, তার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিটি তিনি নিজ মোবাইল ফোন থেকে প্রেরণ করেছিলেন। পরবর্তীতে মোবাইল ফোনটি জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়। ফরেনসিক প্রতিবেদনে চাঁদা দাবির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রায় এক বছর আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হওয়ার কথা ছিল। কীভাবে তার আবার পোস্টিং হলো, তা আমার জানা নেই।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হবিগঞ্জ সদর ও শায়েস্তাগঞ্জ এলাকায় নাজমুল হক কামাল ছিলেন ত্রাসের রাজত্ব কায়েমকারী এক কর্মকর্তা। বিগত সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তিনি সাধারণ মানুষ সহ আলেম ওলামাদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়েছেন। বিএনপি দলের কেন্দ্রীয় ঘোষিত কোনো কর্মসূচিই তিনি হবিগঞ্জে বাস্তবায়ন করতে দেননি।
শুধু রাজনৈতিক নিপীড়নই নয়, তার বিরুদ্ধে নিরীহ লোকজনকে হয়রানি, ভাঙারির দোকান থেকে চাদা আদায় এবং ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা তোলারও গুরুতর অভিযোগ ছিল।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামীলীগ সরকারের পতন ঘটলেও রাতারাতি খোলস বদলে ফেলেছেন এই ধূর্ত কর্মকর্তা। নিজেকে রক্ষা এবং পুনরায় ফায়দা লুটতে তিনি এখন ‘২০০৫ ব্যাচের’ দোহাই দিচ্ছেন। মূলত ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ হওয়ায়, নিজেকে রাজনৈতিকভাবে সেই আমলের ‘বঞ্চিত’ বা ‘সহানুভূতিশীল’ হিসেবে প্রমাণ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। অথচ বিগত ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট সরকারের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করে তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর স্টিমরোলার চালিয়েছেন। সেই চরম অপরাধের শাস্তি বা বিচার না পেয়ে উল্টো অলৌকিক ক্ষমতাবলে যোগদান করেন । বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, নিজের অতীত পাপ ঢাকতে এবং পোস্টিং টিকিয়ে রাখতে তিনি এখন বর্তমান সরকার দলের কিছু প্রভাবশালী নেতার ডানা ও আশ্রয়ের নিচে লুকানোর জন্য জোর লবিং, তদবির ও দৌড়ঝাঁপ করছেন।







