এসিআর ছাড়াই অতিরিক্ত সচিব হওয়ার চেষ্টা!
জ্যেষ্ঠতা ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার মূল্যায়নকে পাশ কাটিয়ে এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে রাজনৈতিক প্রভাবে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার নতুন ফন্দি এঁটেছেন জনপ্রশাসনে বহুচর্চিত যুগ্মসচিব মল্লিকা খাতুন । ক্ষমতার পালাবদলের পরেও প্রশাসনে বহাল থেকে নানা অনিয়ম ও তদবিরের মাধ্যমে পদোন্নতির চেষ্টা চালানোর ঘটনায় পুরো সচিবালয়ে ফের তোলপাড় শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে বিদ্যুৎ বিভাগে কর্মরত থেকেও তিনি একই পথ অনুসরণ করছেন।
ডিও লেটারে পদোন্নতির অভিনব অপচেষ্টা: সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগে কর্মরত চারজন যুগ্মসচিবকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার কাছে একটি আধা-সরকারি পত্র (ডিও লেটার) পাঠান। গত ১৫ অক্টোবর পাঠানো ওই চিঠির সুপারিশকৃত তালিকায় ওপরের দিকেই নাম রয়েছে মল্লিকা খাতুনের। তালিকায় অন্য কর্মকর্তারা হলেন- ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন , মো. জাহিদুল ইসলাম এবং মো. মাহফুজুর রহমান ।
জনপ্রশাসন ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি চাকুরিতে কর্মরত থেকে নিজের পদোন্নতির জন্য মন্ত্রীকে দিয়ে এ ধরনের ডিও লেটার সংগ্রহ করা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২০ অনুচ্ছেদ এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী, চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে রাজনৈতিক বা বাইরের কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে তদবির করা অসদাচরণ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এসিআর এড়াতে কৌশলী আশ্রয়: অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত থাকাকালীন মল্লিকা খাতুন তার নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা, তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ড. রনজিত কুমার সরকারের কাছে বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) দাখিল করা থেকে বিরত থাকেন। এ নিয়ে ড. রনজিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিআর শাখায় লিখিত অভিযোগ দিলে আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
তবে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে দিয়ে ফোন করিয়ে কৌশলে বিভাগীয় মামলার শাস্তি থেকে রেহাই পান তিনি। পরবর্তীতে এসিআর জটিলতা এবং পদোন্নতির বাধা কাটাতে জ্বালানি বিভাগে বদলি হয়ে আসেন এবং মন্ত্রীর মাধ্যমে ডিও লেটার জোগাড়ের এই নতুন কৌশল বেছে নেন।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, কর্মকর্তারা আমার মন্ত্রণালয়ে কর্মরত এবং আমি তাদের এসিআর দিয়ে থাকি। তাদের কাজ ভালো মনে হয়েছে বলেই সুপারিশ করেছি, এতে কোনো সমস্যা দেখি না।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বিষয়টিকে স্বাভাবিক দাবি করে জানান, মন্ত্রী তার অধীনে থাকা কর্মকর্তাদের কাজের বিষয়ে ইতিবাচক মতামত দিতেই পারেন, তবে শেষ সিদ্ধান্ত নেবে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)।
মন্ত্রীদের এমন সাফাই মানতে নারাজ প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা। সাবেক জনপ্রশাসন সচিব এএফএম সোলায়মান চৌধুরী কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, মন্ত্রীদের ডিও লেটার দেওয়া এবং তা প্রক্রিয়াকরণ সম্পূর্ণ বেআইনি। এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে অসদাচরণের দায়ে বিভাগীয় মামলা হওয়া উচিত। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়াও একই মত প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের সুপারিশ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা পুরোপুরি বিনষ্ট করে। পদোন্নতি প্রত্যাশীরা যদি প্রমাণ করতে না পারেন যে এই ডিও লেটারের পেছনে তাদের হাত ছিল না, তবে আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি বাধ্যতামূলক।
বিগত সরকারের আমলে রামরাজত্ব ও বদলি বাণিজ্য: এর আগে গত বছরগুলোতেও মল্লিকা খাতুনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে একচ্ছত্র আধিপত্য ও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ উঠেছিল। বিশেষ করে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে ২০১৯ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তার একক নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিল। তথ্য বলছে, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও পরবর্তী সময়ে মন্ত্রী সামন্তলাল সেনের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পার-১ ও পরিকল্পনা শাখা একাই নিয়ন্ত্রণ করতেন মল্লিকা। তৎকালীন সচিব ও তার ব্যক্তিগত সচিবের যোগসাজশে তিনি বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের চিকিৎসক বদলি, প্রেষণ ও শিক্ষা ছুটি মঞ্জুরের নামে ব্যাপক বাণিজ্য গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত সচিবকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি মন্ত্রী ও সচিবের সাথে যোগাযোগ রেখে স্বাস্থ্য শিক্ষা সেক্টরে নিজের একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, তার মনমতো না চললে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের আসন কমিয়ে দেওয়া কিংবা নবায়ন আটকে দেওয়ার মতো হুমকিও দিতেন তিনি। বিগত সরকারের পতনের পর প্রভাবশালী মহলের সাথে সখ্য বজায় রেখে বিভিন্ন কৌশলে তিনি এখনও পার পেয়ে যাচ্ছেন এবং প্রশাসনকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রশাসনে আতঙ্কের পরিবেশ: সাধারণ কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ডিও লেটারের মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়ার এই নজির যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সিভিল প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার এই সংস্কৃতির অবসান না হলে আমলাতন্ত্রের চূড়ান্ত অধঃপতন রোধ করা অসম্ভব হবে এবং বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।







