জামিল ও বৃষ্টিকে হত্যার আগে থেকেই সব সাজিয়ে রেখেছিল রুমমেট হিশাম
এটি হঠাৎ রাগের বশে করা কোনো অপরাধ নয়। আদালতের নথি বলছে, এটি ছিল পরিকল্পিত, শীতলমস্তিষ্কে সাজানো একটি হত্যার নীলনকশা — যেখানে একজন মানুষ দিনের পর দিন ধরে ধাপে ধাপে খুন করার সরঞ্জাম কিনেছে। চ্যাটজিপিটিতে জিজ্ঞেস করেছে লাশ কীভাবে লুকাবে, নকল দাড়ি কিনে পরিচয় বদলানোর চেষ্টা করেছে এবং শেষ পর্যন্ত তার রুমমেট ও তার বান্ধবীকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে সেতু থেকে পানিতে ফেলে দিয়েছে। এই মানুষটির নাম হিশাম সালেহ আবুগারবিয়েহ। ভিকটিম ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি ডক্টরাল শিক্ষার্থী — জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি।
হত্যার সম্ভাব্য কারণ এখনো সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়, তবে যা জানা গেছে তাতে একটি ছবি ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। জামিল ও বৃষ্টি একে অপরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন — বিয়ের কথাও ভাবছিলেন। বৃষ্টি জামিলের অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়া-আসা করতেন। আবুগারবিয়েহ ছিল একই ফ্ল্যাটের রুমমেট। তার মা জানিয়েছেন, সে “রাগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা” রাখত এবং পরিবারের সঙ্গেও অতীতে সহিংস আচরণ করেছে। কোনো বিরোধ, ঈর্ষা, বা হঠাৎ উত্তেজনা থেকে পরিকল্পনার বীজ রোপিত হয়েছিল কিনা তা তদন্তের বিষয়। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত — হত্যার অন্তত দশ দিন আগে থেকে সে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল। তদন্তে এখনও এ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোন স্পষ্ট কারণ জানানো হয়নি। বৃষ্টির সাথে অভিযুক্ত ঘাতকের কোন সংশ্লিষ্টতার কথা জানা যায়নি। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সম্পুর্ণ অনুমান নির্ভর অপপ্রচার চালাচ্ছে কিছু মানুষ।
৭ এপ্রিল আবুগারবিয়েহ অ্যামাজন থেকে ডাক্টটেপ অর্ডার দেয়। ১১ এপ্রিল অর্ডার দেয় ফায়ার স্টার্টার, চারকোল, ভারী ট্র্যাশ ব্যাগ ও লাইটার ফুয়েল। ১৩ এপ্রিল সে চ্যাটজিপিটিতে টাইপ করে, “কাউকে কালো ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী হয়।” চ্যাটজিপিটি উত্তর দেয়, “এটা বিপজ্জনক শোনাচ্ছে।” তখন আবুগারবিয়েহ লেখে, “তারা কীভাবে জানবে।” হত্যার একদিন আগে ১৫ এপ্রিল সে একটি নকল দাড়ি কেনে এবং চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করে লাইসেন্স ছাড়া বাড়িতে বন্দুক রাখা যায় কিনা।
১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ০৮ মিনিটে বৃষ্টি তার ক্যাম্পাস অফিস থেকে বেরিয়েছেন — সিসিটিভিতে দেখা যাচ্ছে হালকা গোলাপি লম্বা হাতার শার্ট, কালো প্যান্ট ও স্নিকার পরে ছাতা মাথায় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। দুপুর ১২টা ৪১ মিনিটে তিনি জামিলকে ফোন করেছেন। বিকেল ২টা ৪২ মিনিটে ও ২টা ৫২ মিনিটে আরও কল করেছেন। একজন বন্ধু বিকেল ৫টায় তার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন — বৃষ্টি চশমা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তিনি আর আসেননি। সেই রাতে জামিলের ঘরে পাওয়া গেছে বৃষ্টির জুতা, ছাতা এবং ব্যাগে তার ইউএসএফ আইডি ও ক্রেডিট কার্ড — এগুলো থেকে স্পষ্ট সে বিকেলে জামিলের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন।
মেডিকেল এক্সামিনারের রিপোর্ট বলছে, জামিলকে একাধিক ধারালো অস্ত্রে আঘাত করা হয়েছে। ডান তলপেটে দুটি ক্ষত, বাম নাভির পাশে একটি, পিঠের নিচে দশ সেন্টিমিটার গভীর একটি ক্ষত যা কলিজা ফুটো করে দিয়েছে। মরদেহ ট্র্যাশ ব্যাগে ভরার জন্য উরুর কাছে পা গভীরভাবে কেটে মুড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল। হাত ও পায়ের গোড়ালি বাঁধা ছিল এবং দেহটি নগ্ন অবস্থায় ছিল। এই বর্বরতার মাত্রা পুলিশ তদন্তকারীদেরও স্তব্ধ করে দিয়েছে।
হত্যার পর রাত ১০টা ৪৭ মিনিটে আবুগারবিয়েহ ক্লিনিং সরঞ্জাম কিনেছে — ট্র্যাশ ব্যাগ, লাইসোল ওয়াইপস, ফেব্রিজ। রাতের বেলা রুমমেটের চোখের সামনেই ট্রলি গাড়িতে কার্ডবোর্ড বাক্স ভরে কম্প্যাক্টর ডাস্টবিনে ফেলেছে — বলেছে পুরনো কাপড় ফেলছে। ১৭ এপ্রিল রাত ১টা ৩০ মিনিটে তার ফোন হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতুতে থামে। ১টা ৩৪ মিনিটে নয় সেকেন্ডের জন্য ফ্ল্যাশলাইট অ্যাপ জ্বলে ওঠে — লাশ নামাচ্ছিল সে। এরপর ভোর ৩টা ২৭ মিনিটে আবার বের হয়, ৪টা ১৩ মিনিটে আবার সেতুতে থামে — সম্ভবত বৃষ্টির দেহ একই পথে ফেলে দিয়েছে। ভোর ৭টার আগে সে চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করে স্নাইপারের গুলি মাথায় লাগলে কেউ বাঁচে কিনা — কাউকে আরও হত্যার পরিকল্পনা ছিল কিনা তা স্পষ্ট নয়।
তদন্ত এগিয়েছে ধাপে ধাপে। কম্প্যাক্টর থেকে পাওয়া রক্তমাখা ম্যাটের ডিএনএ বৃষ্টির সঙ্গে মিলেছে, টিশার্টের ডিএনএ জামিলের সঙ্গে। অ্যাপার্টমেন্টের কার্পেটে মানবাকৃতির দুটি রক্তের ছাপ পাওয়া গেছে যা মাটিতে কারো পড়ে থাকার প্যাটার্ন দেখাচ্ছে। খাটের নিচে ভারী ট্র্যাশ ব্যাগের তিনটি রোল। সিসিটিভিতে তার সাদা গাড়ি স্যান্ড কি এলাকায় ধরা পড়েছে। ২৩ এপ্রিল রাত ৬টা ৩০ মিনিটে — পুলিশ ঠিক সেদিন মামলা “মিসিং” থেকে “এনডেঞ্জার্ড” করেছে — আবুগারবিয়েহ চ্যাটজিপিটিতে জিজ্ঞেস করে “মিসিং এনডেঞ্জার্ড অ্যাডাল্ট মানে কী।”
২৪ এপ্রিল ভোরে হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতু থেকে জামিলের মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ আবুগারবিয়েহর পারিবারিক বাড়ি ঘিরে ফেলে। সোয়াট টিমের উপস্থিতিতে সে শেষ পর্যন্ত হাত উঁচু করে বাইরে বেরিয়ে আসে। ২৫ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণির পরিকল্পিত হত্যার দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। সে জামিনবিহীন কারাগারে বন্দি।
২৬ এপ্রিল রবিবার রাতে পিনেলাস কাউন্টির ইন্টারস্টেট ২৭৫ ও ৪র্থ স্ট্রিট নর্থের কাছের জলপথ থেকে আরও একটি মানবদেহ উদ্ধার হয়েছে। পিনেলাস কাউন্টির মেডিকেল এক্সামিনার পরিচয় নির্ধারণে কাজ করছেন। সবার ধারণা এটি বৃষ্টির দেহ।
ইউএসএফ বলেছে, “আমাদের হৃদয় তাদের পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আছে।” বাংলাদেশে দুই পরিবার এবং আমেরিকাসহ বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশিরা এখন শোক ও অবিশ্বাসের মধ্যে। যে দুটি মানুষ পিএইচডি করছিলেন, ভবিষ্যৎ গড়ছিলেন, হয়তো একসঙ্গে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছিলেন — তাদের জীবন থামিয়ে দিয়েছে একটি নির্মম, পরিকল্পিত হত্যা। সংবাদমাধ্যমে ভিক্টিমদের পাশে ঘাতকের ছবিও দেখতে চায় না মানুষ।






