সড়কে মৃত্যু, থামে না কান্না, রক্তের স্রোত থামবে কবে?
ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অসুস্থ চালক আর দায়িত্বহীনতায় প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ। একের পর এক দুর্ঘটনায় নিভে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবারের বেঁচে থাকার আলো। নাটোরে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বাসের চাপায় এক পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যু আবারও সামনে এনেছে সড়কের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র। সকালে নিরাপদে বাড়ি ফেরার আশ্বাস দিয়ে বের হওয়া মানুষটি সন্ধ্যায় ফিরবেন কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। কোথাও সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির মৃত্যুতে থেমে যাচ্ছে পরিবারের স্বপ্ন, কোথাও বাবাকে হারিয়ে কাঁদছে অবুঝ শিশু। দেশের সড়ক যেন পরিণত হয়েছে এক অদৃশ্য মৃত্যুকূপে।
নাটোরে ভয়াবহ দুর্ঘটনা
নাটোরে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর ৪টার দিকে বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার সময় বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। এ সময় বাসের চালক ও সহকারী পেছনের সিটে ঘুমাচ্ছিলেন বলে জানা গেছে।
পূজার ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বাসের চাপায় নিহত হন হিটলার বিশ্বাস নামের এক পুলিশ কনস্টেবল। গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ভাঙ্গা উপজেলার চুমুরদী ইউনিয়নের বাবলাতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, হিটলার বিশ্বাস পূজার ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছিলেন। তাকে পেছন থেকে চাপা দিয়ে বাসটি দ্রুত ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যায়।
সড়কে মৃত্যু, থামে না কান্না
সকালে দরজায় দাঁড়িয়ে যে মানুষটি বলে যায়, `ভালোভাবে যেও, সাবধানে থেকো’, সন্ধ্যায় সে আর হেঁটে বাড়িতে ফিরতে পারবেন কি না সেই গ্যারান্টি নেই। ফিরলেও ফেরে লাশবাহী গাড়ির হিমশীতল স্তব্ধতায়, নয়তো কোনো হাসপাতালের রক্তাক্ত ট্রলিতে নিথর হয়ে। কোথাও হয়তো সংসারের একমাত্র ভরসা খেটে খাওয়া মানুষটার শরীরটা পিষ্ট হচ্ছে চাকায়, আর এক নিমেষেই নিভে যাচ্ছে পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার প্রদীপ। কোথাও কোনো অবুঝ শিশু রক্তমাখা কাপড়ে মুখ গুঁজে কাঁদছে, যে হয়তো বুঝতেই পারছে না যে তার মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেওয়ার মতো আর কেউ এই পৃথিবীতে। দেশের একেকটি সড়ক যেন অদৃশ্য মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর আসে আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা, হয় তদন্ত কমিটি এবং ক্যামেরার সামনে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ফোটে। কিন্তু এক টুকরো কাগজের সান্ত্বনা কিংবা কিছু টাকার অনুদান কি কোনো সন্তানের মাথায় বাবার স্নেহময় হাত ফিরিয়ে দিতে পারে? পারে কি কোনো বিধবার শূন্য চোখের সমুদ্রসম হাহাকার মুছিয়ে দিতে? প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতায় মানুষগুলো কেবল একটি সংখ্যা হয়ে বাঁচে, অথচ সেই একেকটি সংখ্যার পেছনে চুরমার হয়ে যায় কত শত পরিবারের বুকভরা আশা।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য- ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। প্রতিবছরের মতো এবারও জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা, শোভাযাত্রা এবং সরকারি র্যালির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। রাজধানী ঢাকা থেকে জেলা শহরগুলো মুখরিত হলেও রাজপথের বিভীষিকাময় বাস্তবতায় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিজস্ব ডাটাবেজ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক পরিসংখ্যান, যাত্রী অধিকার রক্ষা সংস্থাগুলোর জরিপ এবং চালকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা-সংক্রান্ত টার্মিনাল ক্যাম্পগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেশের পরিবহন খাতের এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির চিত্র ফুটে ওঠে। একদিকে লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহনের অবাধ চলাচল, অন্যদিকে লাইসেন্সবিহীন বা মারাত্মক দৃষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগা চালকদের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং তুলে দেওয়া- সব মিলিয়ে মহাসড়কগুলো আজ একেকটি মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশন পৃথক দুটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এসব তথ্য-উপাত্তে দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রকাশিত দীর্ঘমেয়াদি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৫ সালের শেষভাগ পর্যন্ত ১৩ বছরে দেশে মোট ৭২ হাজার ৭৩৬টি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং পঙ্গুত্বসহ গুরুতর আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, স্বাধীনতার আগে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রী নিরাপদ নৌ ও রেলপথে যাতায়াত করতেন। কিন্তু পরবর্তীসময়ে সুদূরপ্রসারী কোনো মহাপরিকল্পনা ছাড়াই পরিবহনব্যবস্থাকে সড়ককেন্দ্রিক করে ফেলা হয়। তার মতে, বিআরটিএর অদক্ষতা এবং অসাধু মালিক-শ্রমিক সিন্ডিকেটের প্রভাবে দেশের সড়ক পরিবহনব্যবস্থা আজ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাত বছরে দেশের সড়কে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ও মোটরসাইকেলের আরোহী হিসেবে ২ হাজার ৯৫৮ শিশু, পথচারী হিসেবে বাসের চাপায় ২ হাজার ৮১২ শিশু এবং যানবাহনের ভেতরে যাত্রী হিসেবে ২ হাজার ১৯৩ শিশু মারা গেছে।
বিআরটিএর সর্বশেষ হালনাগাদ বার্ষিক ডাটাবেজ অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত বৈধ যানবাহনের সংখ্যা ৬৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৭টি। তবে নিবন্ধিত যানবাহনের ধরন বিশ্লেষণ করলে ভারসাম্যহীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মোট নিবন্ধিত যানের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই মোটরসাইকেল, যার সংখ্যা ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৯০টি।
এ ছাড়া দেশে নিবন্ধিত প্রাইভেটকার ৪ লাখ ৩২ হাজার ১১৪টি, অটোরিকশা ৩ লাখ ২৯ হাজার ৩৮৯টি, পিকআপ ১ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৩টি, মাইক্রোবাস ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৮৮টি এবং জিপ ১ লাখ ১৩ হাজার ৯১৪টি। বাস ও মিনিবাস মিলিয়ে এ সংখ্যা ৮৭ হাজার ২৮৫টি। এর মধ্যে বড় বাস ৫৮ হাজার ৫৮৯টি এবং মিনিবাস ২৮ হাজার ৬৯৬টি। এ ছাড়া ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্র্যাক্টর রয়েছে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭৬১টি এবং ট্যাক্সিক্যাব, অ্যাম্বুলেন্সসহ অন্যান্য বিশেষ যান রয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৮২টি।
তবে নিবন্ধিত যানবাহনের বাইরেও সড়কে চলছে বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত যান। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বিআরটিএর নিবন্ধন ছাড়াই অন্তত ৩০ লাখ ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন ও ভটভটি চলাচল করছে। এসব যানবাহনের যান্ত্রিক নিরাপত্তা ও চালকদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো মহাসড়কে উঠে দূরপাল্লার বাসসহ অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এর পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন বাস-ট্রাকও মহাসড়কে চলাচল করছে। তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের যানবাহনের সংখ্যা ৭৫ হাজারের বেশি। বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ফিটনেস পরীক্ষা বাধ্যতামূলক এমন যানবাহনের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজারের বৈধ ও হালনাগাদ ফিটনেস সনদ নেই।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত হন। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ৪ হাজার ২৮৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪ হাজার ১৫৭ জন। আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৩৯১ জন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ মোটরসাইকেল। মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশের জন্য যানটি দায়ী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, টানা গাড়ি চালিয়ে চালকের ঘুমিয়ে পড়া, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং মহাসড়কে নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলারের চলাচল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
এদিকে পুলিশ ও বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা চলতি বছর ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি মামলা ও জরিমানা করলেও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত একটি কারণ হলো পেশাদার চালকদের দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা। চালক সামনে পরিষ্কার দেখতে না পেলে বা রাতে দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগলে ভালো গাড়ি থাকলেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়ানো কঠিন। বিভিন্ন জাতীয় আই কেয়ার চ্যারিটি, বেসরকারি সংস্থা ও চিকিৎসকদের সংগঠনের উদ্যোগে দেশের প্রধান প্রধান টার্মিনালে পরিচালিত বিশেষ চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। এসব ক্যাম্পে পরীক্ষা করা গণপরিবহনের প্রায় ৭০ শতাংশ পেশাদার চালকের চোখে কোনো না কোনো সমস্যা শনাক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যের উল্লেখ রয়েছে।
চালকদের একটি বড় অংশ দূরের সাইনবোর্ড, রাস্তার বাঁক কিংবা বিভাজক ঝাপসা দেখেন। অনেকে চোখের ছানিতে আক্রান্ত। আবার কারও কারও রাতে আলোর প্রতিফলনে দেখতে সমস্যা হয়। এ ছাড়া বর্ণান্ধতার কারণে কেউ কেউ ট্রাফিক সিগন্যালের লাল ও সবুজ রং শনাক্ত করতেও সমস্যায় পড়তে পারেন। চালকদের দৃষ্টিশক্তি নিয়মিত পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা না হলে এসব সমস্যা সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০২৩ অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। পাঁচ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় ৯২ শতাংশই ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
অর্থাৎ, সড়ক দুর্ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত অসতর্কতার ফল নয়; এটি একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট। এ সংকট মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, চালকদের শারীরিক সক্ষমতা যাচাই এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিপরীতে, একই বছরে বাংলাদেশের সরকারি হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮৪। মৃত্যুর হিসাবে এই বড় পার্থক্য সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংজ্ঞা, প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যানের সমন্বয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। তাই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য, সমন্বিত ও স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
জাতিসংঘ ২০২১ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়কালকে সড়ক নিরাপত্তার দ্বিতীয় দশক হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ দশকের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনায়ও নিরাপদ সড়ক, যানবাহনের নিরাপত্তা, গতিসীমা, সড়ক ব্যবহারকারীদের আচরণ এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাসেবার ওপর সমন্বিত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৭ জন এবং প্রতি ঘণ্টায় তিন থেকে চারজন প্রাণ হারান। অর্থাৎ, বছরে এই মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় মাসে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৬৩২ জন এবং সপ্তাহে প্রায় ৬০৭ জনে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ হারায়। বাংলাদেশের জিডিপির আকার বিবেচনায় এ ক্ষতির পরিমাণ বছরে কয়েক লাখ কোটি টাকা হতে পারে। চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, কর্মক্ষম মানুষ হারানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যয়-সব মিলিয়ে এ ক্ষতি জাতীয় উন্নয়নকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালকের অসুস্থতা, অবসাদ, ক্লান্তি ও যানবাহনের ফিটনেসবিহীনতা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া অধিকাংশ গাড়িতে নিরাপদ ব্যবস্থা (সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ) কার্যকরভাবে অনুসরণ না করায় দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা অনুযায়ী, দেশের গাড়িচালকদের অর্ধেকের বেশি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। তাঁদের কারও দৃষ্টিশক্তি কম, কেউ উচ্চ রক্তশর্করা বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় আক্রান্ত।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, চালক ও যানবাহনের বেহাল দশার কারণে সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিলে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বিশেষজ্ঞরা ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’র ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এটি সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নের একটি পদ্ধতি, যেখানে মানুষের ভুল করার স্বাভাবিক প্রবণতা এবং ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো- উভয় বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর উপায় নিয়ে বিআরটিএ প্রশাসন ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিআরটিএ কর্মকর্তাদের দাবি, শুধু জরিমানা ও মামলা করে দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য মালিক, চালক ও পথচারীদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চালকের ওপর দায় চাপালে চলবে না। প্রচলিত ম্যানুয়াল ফিটনেস পরীক্ষার পরিবর্তে আধুনিক যান্ত্রিক পরীক্ষা চালু, সড়কের নকশাগত ত্রুটি সংশোধন এবং বিআরটিএকে আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত করে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি পদ্ধতিতে পরিচালনা করতে হবে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ঘোষণা দেন, ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ এবং আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার আলোকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ চূড়ান্ত, অনুমোদন ও প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও বেতনের অভাব, মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহনে চাঁদাবাজি।
ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও গণপরিবহনে চাঁদাবাজি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। শিশুদের নিরাপত্তায় নিরাপদ সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি।— রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান
তিনি বলেন, শিশুদের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা নিরাপদ করা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানো এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসাসেবা বাড়ানো, চিকিৎসার জন্য বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর বাস্তবায়ন জরুরি।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের রোড সেফটি প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী শারমিন রহমান বলেন, তরুণদের একটি বড় অংশ মোটরসাইকেল ব্যবহার করায় অতিরিক্ত গতি, হেলমেটের সঠিক ব্যবহার না করা এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেকিংয়ের কারণে তারা সড়কে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত গতি, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে অনীহা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা ও জরুরি সেবা না পাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তাই নিরাপদ যানবাহন, গতি নিয়ন্ত্রণ, সড়ক ব্যবহারকারীদের আচরণ এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে নৌ ও রেলপথের ব্যবহার বাড়িয়ে সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে একের পর এক সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এতে মানুষের যাতায়াতে সড়কের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। অথচ সেই তুলনায় উন্নত গণপরিবহন ও সমন্বিত যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা, মালিক-শ্রমিক ও কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক, সড়ক নির্মাণের ত্রুটি এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা উপেক্ষা করে সড়ককেন্দ্রিক উন্নয়ন এবং রেল ও নৌপথের ব্যবহার সংকুচিত করার নীতির কারণে সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। বিগত সরকারের নীতিগত ভুল, অনিয়ম ও দুর্নীতিও সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সড়ক, যানবাহন, চালক, মালিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা দুর্বলতার কারণে পরিবহন খাতে শত শত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা কমানো কঠিন। সড়কের পাশাপাশি রেল ও নৌপথেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। পরিবহন খাতের বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো দূর করা না গেলে হতাহতের সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, পরিবহন খাতের সমস্যা সমাধানে করণীয় নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা যায়নি। কেন এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, তা বর্তমান সরকারকে মূল্যায়ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের শতভাগ রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। দীর্ঘ ৫৪ বছরে পরিবহন খাতে জমে থাকা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তবে এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।







