এপস্টেইন ফাইল নিয়ে বিশ্বে কেন এত আলোচনা
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে গত কয়েক মাস ধরে আলোচনায় ‘এপস্টেইন ফাইল’। মূলত মার্কিন বিনিয়োগকারী জেফরি এপস্টেইনের অপরাধ তদন্তের সময় পাওয়া নথিগুলোর এই নামকরণ করা হয়েছে। এসব নথি দেখাচ্ছে, গণিতের শিক্ষক থেকে এক সময় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বনে যাওয়া এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের। তালিকায় আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পও।
যৌন নিপিড়ন ও নারী পাচারের মামলায় গ্রেপ্তারের পর ২০১৯ সালে কারাগারে আত্মহত্যা করেন এপস্টেইন। নিপিড়ন ও পাচারের মামলা তদন্ত করতে গিয়ে পাওয়া যায় বহু ই-মেইল, ফ্লাইটের তথ্যসহ হাজারো নথি। এরপর থেকেই সেগুলো প্রকাশের দাবি জানাচ্ছিলেন ভুক্তভোগী ও অধিকারকার্মীরা। কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এতদিন তা প্রকাশ করা হয়নি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একটি আইন পাস হয়। যেটির আওতায় নথিগুলো প্রকাশে বাধ্যবাধকতার মুখে পড়েছে মার্কিন প্রশাসন। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজি) আংশিক নথি প্রকাশ করে। যেখানে এপস্টেইনের সঙ্গে দেখা গেছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাবেক সদস্য অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে। আরো আছেন প্রয়াত মাইকেল জ্যাকসন, রাস আওয়ার খ্যাত অভিনেতা ক্রিস টাকারসহ বিনোদন জগতের পরিচিত নানা মুখ। মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে ধাপে ধাপে আরো নথি প্রকাশ করা হবে।
তাঁর সম্পর্কে জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৭৬ সালে। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় জর্জিয়ার ডাল্টন শহরের একটি স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন এপস্টেইন। এক ছাত্রের বাবা একদিন তাঁকে একটি প্রদর্শনী দেখার আমন্ত্রণ জানান। সেখানে পরিচিত হন আরেক ছাত্রের বাবার সঙ্গে। ওই ব্যক্তি এপস্টেইনের গণিতের প্রতিভা শুনে মুগ্ধ হন। পরে পরিচয় করিয়ে দেন নিউইয়র্কের অন্যতম বিনিয়োগকারী ব্যাংক বিয়ার স্টার্নসের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা এস গ্রিনবার্গের সঙ্গে।
গ্রিনবার্গের সঙ্গে দেখা করতে নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজার ও শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু ওয়াল স্ট্রিটে যান এপস্টেইন। নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, কোনি আইল্যান্ডের এক শ্রমিক পরিবারে জন্ম নেওয়া এপস্টেইন ধনী হওয়ার জন্য ব্যাকুল ছিলেন। তাঁকে প্রথম দেখাতেই তা বুঝতে পেরেছিলেন গ্রিনবার্গ।
বিয়ার স্টার্নসে চাকরি পাওয়ার পর গ্রিনবার্গের মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এপস্টেইনের। এক সময় অন্য কর্মকর্তারা জানতে পারেন নতুন এই কর্মী কলেজ পাসই করতে পারেননি। কিন্তু বসের মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে সে দফায় এপস্টেইনকে ছাড় দেওয়া হয়। মূলত, এর পর থেকেই তিনি উড়তে থাকেন।
টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, এপস্টেইন প্রায়ই মিথ্যা বলতেন। ১৯৮০ সালের পর তিনি নিয়মিত ফ্লোরিডার পাম বিচে যেতেন। যেখানে অনেক তরুণীর সঙ্গে তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কো.’ গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানটি ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করত। সে বছর থেকেই এপস্টেইন নিজেকে ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেন। তিনি ফ্লোরিডায় একটি প্রাসাদ, নিউ মেক্সিকোয় একটি র্যাঞ্চ (গবাদিপশু পালনের খামার) এবং নিউইয়র্কে বাড়িসহ নানা সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ গড়ে তোলেন তারকা ব্যক্তিত্ব, শিল্পী ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে।
২০০২ সালে একটি বিশেষ জেটে করে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, অভিনেতা কেভিন স্পেসি ও ক্রিস টাকারকে আফ্রিকা ভ্রমণে নিয়ে যান। ২০০৩ সালে এপস্টেইন নিউইয়র্ক সাময়িকী কেনার চেষ্টা করেন। একই বছরে তিনি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ৩ কোটি ডলার অনুদান দেন। যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিদ পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর মা-বাবা পুলিশকে জানান, পাম বিচে এপস্টেইনের বাড়িতে তাদের মেয়েকে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে। পরে পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে বাড়িটির বিভিন্ন স্থানে কিশোরীদের ছবি খুঁজে পায়। বছরের বছরগুলোতে বিভিন্ন সময় এপস্টেইনের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপিড়নের অভিযোগ ওঠে। সাজা হলেও তিনি বিশেষ সুবিধায় বাইরে ছিলেন। অবশেষে ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হন। ওই বছরের আগস্টে কারাগারে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ২০২১ সালে একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তাঁর সাবেক প্রেমিকা ও সহযোগী গিসলাইন ম্যাক্সওয়েল।
ফাইলে কী পাওয়া গেছে
এপস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন নিপিড়নের অভিযোগ ওঠার পর বিভিন্ন সময় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ থাকা ব্যক্তিদের ছবি প্রকাশ হয়েছে। শুক্রবার নতুন করে প্রকাশিত নথিতেও তারা আছেন। তবে ছবিতে থাকা মানে এই নয় যে, তারাও অপরাধে জড়িত।
প্রকাশিত ছবিগুলোতে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রমাণ নেই। ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি। তবে এপস্টেইনের উত্থানের বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঙ্গে কাদের যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল তা নিয়ে অনেকের মাঝে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
প্রকাশিত একটি ছবিতে এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সাবেক যুবরাজ মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে দেখা গেছে। যা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, ব্রিটিশ রাজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও এপস্টেইনের যোগাযোগ ছিল। ছবিতে মাউন্টব্যাটেনকে কয়েকজন নারীর কোলে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন গিসলাইন ম্যাক্সওয়েল। স্কাই নিউজ জানিয়েছে, ছবিটি তোলা হয়েছে রাজপরিবারের ব্যক্তিগত বাসভবন স্যান্ডরিংহ্যামে।
আরেকটি ছবিতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট (১৯৯৩-২০০১) বিল ক্লিনটন হট টাবে বিশ্রাম নিচ্ছেন। অন্য ছবিতে তাঁকে দেখা গেছে এপস্টেইনের সহযোগী ম্যাক্সওয়েল, সঙ্গীতশিল্পী মাইকেল জ্যাকসন, ডায়ানা রস, মিক জ্যাগার এবং অভিনেতা কেভিন স্পেসির সঙ্গে।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, এপস্টেইন গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে বিল ক্লিনটনের সামাজিক সম্পর্ক ছিল। ক্লিনটন বিভিন্ন সময় দাবি করেছেন, তিনি শিশু যৌন নিপিড়নের বিষয়ে জানতেন না। ক্লিনটনের মুখপাত্র অ্যাঞ্জেল উরেনা বলেছেন, ছবিগুলো ২০ বছরের বেশি পুরোনো। অপরাধ সামনে আসার পর থেকে এপস্টেইনের সঙ্গে ক্লিনটনের বন্ধুত্ব ভেঙে যায়।
এর আগে প্রকাশিত ছবিতে হাস্যোজ্জ্বল ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও দেখা যায়। কিন্তু মার্কিন গণমাধ্যম পিবিএস জানিয়েছে, অনলাইনে প্রকাশিত নথির অন্তত ১৬টি ফাইল হঠাৎ সরানো হয়েছে। এই ফাইলগুলোর মধ্যে একটিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিলেন।
ফাইল প্রকাশের প্রভাব কী
যেহেতু এপস্টেইন স্পর্শকাতর মামলার আসামি ছিলেন, তাই ফাইল প্রকাশ না করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ ছিল। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য ফাঁস হলে তা রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা ছিল অনেকের।
পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির নেতারাও ফাইল প্রকাশের বিরোধীতা করেন। প্রকাশের দাবি উঠলে ট্রাম্প নিজেও বলেছিলেন, ডেমোক্র্যাটরা প্রতারণামূলকভাবে এই চাপ তৈরি করছে।
শুক্রবার ফাইল প্রকাশের পর নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি সরানোর পর ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন অনেক নথি আড়াল করছে। ডেমোক্র্যাটের জ্যেষ্ঠ নেতা চাক শুমার বলেছেন, এই ছবি সরানোর মধ্য দিয়েই বোঝা যায় প্রশাসন আরো কত ফাইল গোপন করতে চাইছে।
অন্যদিকে ফাইল প্রকাশের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এপস্টেইনের দ্বারা নিপিড়নের শিকার নারীরা। তাদের বেশ কয়েকজনের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। ফলে ফাইল প্রকাশ নিয়ে আরো সমালোচনার মুখে পড়তে যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।








