গোপন ভিডিও মুছতে প্রেমিকা তারিনের পরিকল্পনায় খুন
কক্সবাজারে ছাত্রদল কর্মী ও জুলাই আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম হত্যাকাণ্ডে পুলিশ এখনো কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। তবে যুগান্তরের অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য ওঠে এসেছে। প্রেমের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ব্যক্তিগত ‘গোপন ভিডিও’ ঘিরেই এই নির্মম হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত ২৪ মার্চ রাত ১০টার দিকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন ঝাউবাগানের কবিতা চত্বরে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় খোরশেদকে।
অনুসন্ধান বলছে, নিজের গোপন ভিডিও মুছে ফেলতে পেশাদার ছিনতাইকারী-সন্ত্রাসী ভাড়া করেছিলেন প্রেমিকা তারিন। তার পরিকল্পনাতেই খোরশেদ খুন হন। এতে নেতৃত্ব দেয় মোহাম্মদ হারুন, মোহাম্মদ জিসান (বাসানি) ও বেলাল ওরফে ঘোড়া বেলাল। ঘটনার পর তারা সমিতিপাড়া এলাকায় বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রজেক্টে কাজ করা নাইটগার্ড রিয়াদের আশ্রয়ে রাত কাটায় এবং মাদক সেবন করে। মাত্র ৫টি ইয়াবার বিনিময়ে রিয়াদ তাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন।
এ ঘটনায় মামলা হলেও অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত আসামিরা বাদ পড়েছে এবং তারিনকে মামলার সাক্ষী করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি ছুরি ও কয়েকটি মাথার খোপা (ফুল) উদ্ধার করা হয়। ছুরিটি তারিনের বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খুনিদের পরিচয় : খোরশেদ হত্যায় ৪/৫ জনের সম্পৃক্ততা থাকলেও তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন-পেশাদার ছিনতাইকারী মোহাম্মদ হারুন। সে ক্রসফায়ারে নিহত খারুল আমিনের ভাই। তার বাবার নাম বশির আহমেদ। স্থায়ী ঠিকানা মহেশখালী। তার বিরুদ্ধে অন্তত তিন ডজন মামলা রয়েছে। সম্প্রতি ছিনতাইকারী হিসাবে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে। মোহাম্মদ জিসান (বাসানি) বিচ বাইকচালক হলেও পেশাদার ছিনতাইকারী। তার বাবা নূরুল ইসলাম বাসানি। সমিতিপাড়া ১ নম্বর মসজিদ গেট এলাকার বাসিন্দা। বেলাল ওরফে ঘোড়া বেলালের বাবার নাম নুরু সালাম। বালিকা মাদ্রাসা এলাকার বাসিন্দা সে। সেও পেশাদার ছিনতাইকারী।
গোপন ভিডিও ঘিরে দ্বন্দ্ব : অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের কারণে খোরশেদের কাছে তারিনের সঙ্গে একান্ত সময় কাটানোর একাধিক ভিডিও ও ছবি ছিল। সম্প্রতি তারিন ঢাকায় গিয়ে অন্য এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে বিষয়টি নিয়ে দুজনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বিরোধ একপর্যায়ে এমন অবস্থায় পৌঁছায়, দুজনই একে অপরকে হুমকি দিতে শুরু করেন। বেশি বাড়াবাড়ি করলে খোরশেদ ভিডিও প্রকাশের হুমকি দিয়ে তারিনকে দমানোর চেষ্টা করেন। এতে তারিন আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত ‘সমঝোতার’ কথা বলে সৈকতের কবিতা চত্বরে দুজনের দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।
ছিনতাইকারী হারুনের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানান, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় হারুনের মোবাইলে একটি কল আসে। কলদাতা জানায়, কবিতা চত্বরে এক ছেলে ও এক মেয়ে দেখা করবে; বনিবনা না হলে ছেলেটির মোবাইল ছিনতাই করে মেয়েটির কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তার দাবি, কলদাতা আয়ুব নামের এক ব্যক্তি, যিনি হারুনের বন্ধু এবং তারিনেরও ঘনিষ্ঠ।
যেভাবে খোরশেদ হত্যাকাণ্ড: ঘটনার দিন রাত ৯টার পর খোরশেদ ও তারিন আলাদা রিকশায় কবিতা চত্বরে পৌঁছান। সেখান থেকে তারা সৈকতের বালিয়াড়িতে নেমে কথা বলতে শুরু করেন, যা দ্রুত তর্ক-বিতর্ক ও হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, একপর্যায়ে তারিন ব্যাগ থেকে একটি ছুরি বের করে আঘাতের চেষ্টা করলে খোরশেদ আত্মরক্ষায় তার চুলের মুঠি ধরে ধস্তাধস্তি করেন। ঠিক তখনই ঝাউবনের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে ওতপেতে থাকা হারুন, জিসান ও বেলালসহ অন্তত চারজন। তারা ছুরি দেখিয়ে খোরশেদের মোবাইলসহ সবকিছু দিতে বলে। আশ্চর্যজনকভাবে ঝগড়া ভুলে তারিনও খোরশেদকে মোবাইল ছিনতাকারীদের দিয়ে দিতে বলেন। তবে খোরশেদ প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। এ সময় তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত ও কিল-ঘুসি মারে তারা। একপর্যায়ে মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার পর সেটি তারিনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর তারিন ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে ফোনটি যাচাই করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ধারণা করা হচ্ছে, সেসব ভিডিও তখনই মুছে ফেলা হয়। হামলাকারীরা তাকে ফেলে পালিয়ে যায়।
সূত্র বলছে, ঘটনার প্রায় ২০ মিনিট পর তারিন আবার খোরশেদের কাছে ফিরে যান। ততক্ষণে ব্যাপক রক্তক্ষরণ হয় খোরশেদের।
আগেই দেখে নেওয়ার হুমকি দেন তারিন : নিহত খোরশেদের বন্ধু রবিউল হোসেন জানান, ১৯ মার্চ রাতে আপন টাওয়ারের পাশে তাদের অস্থায়ী হালিম-বিরিয়ানি দোকানে উপস্থিত হন তারিন। এ সময় খোরশেদ কোথায়-জানতে চাইলে তারা জানান, জানেন না। এ সময় রবিউল ছাড়াও আকিব, ফেরদৌস ও ইয়াসিন উপস্থিত ছিলেন। পরে তারিন বলেন, তার ফোনে ব্যালেন্স নেই এবং একটি ফোন চান। ইয়াসিন তার ফোনটি দিলে খোরশেদকে কল করেন তারিন। ওইদিন ইয়াসিনের ব্যবহৃত ০১৮৮৩৪৯৬০৭০ নম্বর থেকে রাত ৮টা ৩৬ মিনিটে ২ মিনিট ১১ সেকেন্ড কথা বলেন তারিন। এ সময় খোরশেদকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন এবং ৫ মিনিটের মধ্যে তার কাছে না এলে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন বলে জানান রবিউল।
তারিনের যত অসংগতিপূর্ণ আচরণ: সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, খোরশেদ বাসা থেকে বের হন রাত ৯টা ১৭ মিনিটে এবং তারিন রিকশায় কবিতা চত্বরে পৌঁছান ৯টা ২৭ মিনিটে। লাশ উদ্ধার করা খোরশেদের বন্ধু শাহজাহান জানান, রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তারিন নিজের মোবাইল থেকে তাকে কল দেন, তবে তিনি রিসিভ করেননি। পরে ১০টা ২৪ মিনিটে খোরশেদের মোবাইল থেকে কল পেয়ে তিনি জানান, খোরশেদকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। পরে শাহজাহান ঘটনাস্থলে গিয়ে খোরশেদকে উদ্ধার করে ১০টা ৪১ মিনিটে হাসপাতালে নেন, সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শাহজাহানের দাবি, ফোন পাওয়ার ১ মিনিটের মধ্যেই তিনি ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওয়ানা দেন এবং ১০ মিনিটের কম সময়ে পৌঁছান। তারিন তাদেরকে দেখে চিৎকার করে বলেন, ছিনতাইকারীরা খোরশেদকে ছুরিকাঘাত করেছে। তিনি প্রায় ৩০০ ফুট দূর থেকে খোরশেদের অবস্থান দেখিয়ে দেন। শাহজাহান জানান, খোরশেদকে গাড়িতে তোলার সঙ্গে সঙ্গেই তারিন ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। তারিন খোরশেদের মোবাইল থেকে কল দিলেও সেদিন খোরশেদের প্যান্টের পকেটেই তার মোবাইল পাওয়া যায়।
শাহাজান আরও জানান, ঘটনাস্থলে তারিনকে থ্রি-পিস পরা অবস্থায় দেখা গেলেও হাসপাতালে তিনি বোরকা ও মাস্ক পরে আসেন এবং অন্তত ২০-৩০ মিনিট পর সেখানে পৌঁছান, যা ছিল রহস্যজনক।
খোরশেদের মা সাবেকুন নাহার বলেন, তারিনই তাকে ডেকে নিয়ে হত্যার ফাঁদে ফেলেছে। তিনি দাবি করেন, তাদের মধ্যে তিন মাস ধরে কোনো সম্পর্ক ছিল না।
মামলার বাদী খোরশেদের ছোট ভাই নাওশাদ ও ঘনিষ্ঠদের কেউ কেউ জানান, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার ছুরিটি তারিনেরই ছিল। সেটা দিয়ে সে সবসময় বন্ধুদের ভয় দেখাতো।
এদিকে ঘটনার পর থেকে তারিনকে নিয়ে নানা অভিযোগ উঠলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। গত তিন সপ্তাহ ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সফল হননি প্রতিবেদক। কয়েক দফায় সামনাসামনি কথা বলার আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি এড়িয়ে যান। তবে ফোনে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। অন্যদিকে মামলার কয়েকজন আসামি ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ দেখিয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান বলেন, খোরশেদ হত্যার বিষয়ে কয়েকদিনের মধ্যে অগ্রগতি পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, মামলায় কার নাম আছে বা নেই, সেটি বড় বিষয় নয়, পুলিশ প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য কাজ করছে। সুত্র: যুগান্তর







