সরকারি অর্থে বৃক্ষরোপণ, বাস্তবে দায়সারা কর্মসূচি—অনিয়মের অভিযোগ
পরিবেশ সুরক্ষা ও সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনের লক্ষ্যে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেওয়া হলেও রোপণের কয়েক দিনের মধ্যেই উধাও হয়ে গেছে অধিকাংশ চারা। কোনোটি গবাদিপশুর খাদ্যে পরিণত হয়েছে, আবার কোনোটি পানির অভাবে শুকিয়ে মারা গেছে। চারাগাছের সুরক্ষায় পর্যাপ্ত বেড়া দেওয়া, নিয়মিত পানি দেওয়া ও রক্ষণাবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় সরকারি অর্থ ব্যয়ে নেওয়া এ কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রারিপ প্রকল্পের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কে প্রায় ৫ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। এ জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০ লাখ টাকা। তবে রোপণের পরপরই অধিকাংশ চারাগাছ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা-বীরগাঁও সড়কে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় এক মাস আগে সড়কের দুই পাশে রোপণ করা প্রায় ৪০০ চারার অধিকাংশই নেই। যে কয়েকটি চারা টিকে আছে, সেগুলোর অবস্থাও নাজুক। অনেক চারার চারপাশে কোনো বেড়া নেই। কোথাও আবার এক-দুটি বাঁশের খুঁটির সঙ্গে প্লাস্টিকের টুকরা দিয়ে চারা আটকে রাখা হয়েছে। গবাদিপশুর হাত থেকে চারাগাছ রক্ষায় কার্যকর কোনো প্রতিরোধক ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আকারে ছোট চারা রোপণের পর সেগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়নি। ফলে পানির অভাবে অনেক চারা শুকিয়ে মারা গেছে। আবার সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় রোপণের কয়েক দিনের মধ্যেই অনেক চারা গরু-ছাগলের খাদ্যে পরিণত হয়েছে।
বীরগাঁও পূর্বপাড়ার বাসিন্দা রুশন আলী বলেন, ‘ছোট ছোট চারা খালি গর্ত করে একটি বাঁশের খুঁটি দিয়ে রোপণ করে গেছে দুয়েকজন লোক। একেকটা চারা রোপণে বেশি হলে ৫০ টাকা খরচ পড়েছে। এরপর আর কেউ চারার কোনো খবর রাখেনি। গরু-ছাগলে খেয়ে প্রায় সব নষ্ট করে দিয়েছে।’
জুবায়েল বক্স নামের এক তরুণ বলেন, ‘সড়কে চারা রোপণে চরম অনিয়ম হয়েছে। এভাবে গাছ রোপণের চেয়ে না রোপণ করাই ভালো। গাছ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো উদ্যোগ নেই।’ পরিবেশের সুরক্ষায় গাছ রোপণের পর নিয়মিত পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি চারার জন্য ৫০০ টাকা করে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে এর তুলনায় খুব কম অর্থ ব্যয় করে চারা রোপণ করা হয়েছে। রোপণের পর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় সরকারি অর্থ ব্যয়ে নেওয়া কর্মসূচির কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ তাঁদের।
এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী সাজেদুল ইসলাম বলেন, রোপণ করা কিছু গাছ চুরি হয়েছে। বাজেট পাওয়া গেলে নষ্ট ও হারিয়ে যাওয়া স্থানে পুনরায় চারা রোপণ করা হবে।
সুনামগঞ্জ এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রারিপ প্রকল্পের আওতায় ১০ লাখ টাকা বরাদ্দে শান্তিগঞ্জ-পাগলা-বীরগাঁও সড়ক, জামালগঞ্জ-সেলিমগঞ্জ এবং জামালগঞ্জ-জয়নগর জিসি ভায়া নয়াগাঁও সড়কসহ বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কে ৫ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। এছাড়া আম্পান প্রকল্পের আওতায় আরও ৫ হাজার গাছ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গাছ রোপণের পর শক্ত বেড়া দিতে হয়। তবে বরাদ্দ কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এটি সম্ভব হয়ে ওঠে না। চারাগাছ রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভালের জন্য মজুরি দিয়ে লোক রাখতে হয়। কিন্তু রারিপ প্রকল্পে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়নি। তবে ঠিকাদারকে বলা আছে, যেসব গাছ মারা যাবে সেগুলো পুনরায় রোপণ করতে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আম্পান প্রকল্পের আওতায় যে ৫ হাজার গাছ রোপণ করা হবে, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শ্রমিকের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। রোপণ কাজ সঠিকভাবে করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখানে অনিয়মের সুযোগ নেই।’
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু চারা রোপণ করলেই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সফলতা আসে না। রোপণের পর অন্তত কয়েক বছর নিয়মিত পানি দেওয়া, বেড়া দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার ও পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হয়। অন্যথায় সরকারি অর্থ ব্যয়ে নেওয়া এসব কর্মসূচি কাগজে-কলমে বাস্তবায়িত হলেও মাঠপর্যায়ে এর সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
তাঁদের মতে, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে রোপণ করা প্রতিটি চারার অবস্থান, সংখ্যা ও টিকে থাকার হার নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চারা নষ্ট হওয়ার কারণ চিহ্নিত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।







