কোরআনের বর্ণনায় বিপদমুক্তির ৭ আমল
সুখ ও দুঃখ মিলেই পার্থিব জীবন। পৃথিবীতে আল্লাহ দুঃখ, কষ্ট ও বিপদ সৃষ্টি করেছেন, যেন সুখের স্রোতে ভেসে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন না দেয় এবং তার স্রষ্টাকে ভুলে না যায়। আল্লাহ যেমন পৃথিবীতে দুঃখ, কষ্ট ও বিপদ সৃষ্টি করেছেন, তেমনি এসব থেকে মুক্তির উপায় বাতলে দিয়েছেন। নিম্নে কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিপদ থেকে মুক্তির উপায় বর্ণনা করা হলো।
বিপদ পরীক্ষা ও অনুগ্রহ
একজন মুমিনের জন্য বিপদ শুধু দুঃখ ও অনুতাপের বিষয় নয়। মুমিনের কাছে বিপদ আল্লাহর পরীক্ষা এবং নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম। কেননা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। তুমি শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত : ১৫৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সব কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শোকর আদায় করে আর অসচ্ছলতা কিংবা দুঃখ-মুসিবতে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, উভয়টিই তার জন্য কল্যাণকর।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭৩৯০)
ইবাদতে দূর হয় বিপদ
মুমিনের ওপর যখন কোনো বিপদ আসে, তখন সে আল্লাহমুখী হয় এবং আল্লাহর স্মরণ, ইবাদত ও প্রার্থনার মাধ্যমে সে বিপদমুক্তির পথ খোঁজে। এটাই মহানবী (সা.)-এর প্রদর্শিত পথ। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার সূর্য গ্রহণ হলো।
রাসুলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘ সময় নিয়ে নামাজ আদায় করলেন। অতঃপর তিনি লোকজনের উদ্দেশে খুতবা দান করেন। প্রথমে তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাবলি বর্ণনা করেন। এরপর তিনি বলেন, সূর্য ও চন্দ্র আল্লার নিদর্শনগুলোর মধ্যে দুটি নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্য গ্রহণ ও চন্দ্র গ্রহণ হয় না। কাজেই যখন তোমরা তা দেখবে তখন তোমরা আল্লাহর নিকট দোয়া করবে। তাঁর মহত্ত্ব ঘোষণা করবে, নামাজ আদায় করবে এবং সদকা করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৪৪)
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম জাওজি (রহ.) বলেন, নবী (সা.) গ্রহণের সময় নামাজ, দাসমুক্তি, আল্লাহর জিকির ও সদকার প্রতি ধাবিত হতে বলেছেন। কেননা এসব কাজের মাধ্যমে বিপদের কারণ দূর হয়। (আল ওয়াবিলুস সায়্যিব, পৃষ্ঠ-১৪২)
যেসব আমলে বিপদ দূর হয়
কোরআন-হাদিসের আলোকে যেসব আমলে বিপদ দূর হয় তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো—
১. কালেমা তাওহিদ পাঠ : কালেমা তাওহিদ পাঠের মাধ্যমে ঈমান নবায়ন করা হয় এবং এর মাধ্যমে বান্দার বিপদ দূর হয়। পবিত্র কোরআনে ইউনুস (আ.)-এর বিপদ থেকে মুক্তির বর্ণনা এভাবে করা হয়েছে—‘আর স্মরণ কোরো জুন-নুনের (ইউনুস) কথা, যখন সে ক্রোধভরে বের হয়ে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল আমি তার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করব না। অতঃপর সে অন্ধকার থেকে আহ্বান করেছিল, তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তুমি পবিত্র, মহান! আমি সীমা লঙ্ঘনকারী। তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে উদ্ধার করেছিলাম দুশ্চিন্তা থেকে এবং এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করে থাকি।’(সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৮৭-৮৮)
আয়াত থেকে বোঝা যায়, কালেমা তাওহিদ বিপদ থেকে মুক্তির অন্যতম মাধ্যম।
২. নিজেকে আল্লাহর হাতে সমর্পণ করা : মুমিন যখন নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে, তখন আল্লাহ তাকে যাবতীয় বিপদ থেকে রক্ষা করেন। কোরআনে ফেরাউনের হাত থেকে একজন মুমিনের মুক্তি লাভের ঘটনা বর্ণনা করে বলা হয়েছে, ‘আমি আমার ব্যাপার আল্লাহর হাতে অর্পণ করছি; আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন। অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং কঠিন শাস্তি পরিবেষ্টন করল ফেরাউন সম্প্রদায়কে।’ (সুরা মুমিন, আয়াত : ৪৪-৪৫)
৩. নামাজ আদায় করা : বিপদমুক্তি ও আল্লাহর সাহায্য লাভের মাধ্যম। মহান আল্লাহ নিজেই বান্দাকে নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কোরো।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত : ১৫৩)
৪. ধৈর্য ধারণ করা : ধৈর্য বান্দার প্রতি আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহকে তরান্বিত করে। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কোরো।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত : ১৫৩)
এ ছাড়া নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা প্রদান করবেন। আর কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো দান দেওয়া হয়নি, যা ধৈর্য অপেক্ষা উত্তম ও প্রশস্ত হতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৬৯)
৫. বেশি বেশি ইস্তিগফার করা : ইস্তিগফার হলো অতীতের ভুলত্রুটি ও পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। ইস্তিগফার শুধু বিপদ থেকে মুক্তি দেয় না, বরং তা বিপদ প্রতিহতও করে। নিম্নোক্ত আয়াতে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ এমন নন যে তুমি তাদের মধ্যে থাকবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন। আর আল্লাহ এমনও নন যে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৩৩)
৬. আল্লাহর জিকির : আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ পাঠের মাধ্যমে বান্দা পার্থিব জীবনের সংকট ও সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা পায়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি জানি, তারা যা বলে তাতে তোমার অন্তর সংকুচিত হয়; সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কোরো এবং তুমি সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।’ (সুরা হিজর, আয়াত : ৯৭-৯৮)
৭. বিনীত হয়ে প্রার্থনা করা : আল্লাহ অসীম দয়ার আধার। বান্দা যখন বিপদগ্রস্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে হাত তোলে এবং বিনীত হয়ে প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ বান্দার বিপদ দূর করে দেন। আল্লাহ বলেন, ‘বরং তিনিই সেই সত্তা, যিনি আর্তের আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন।’ (সুরা নামল, আয়াত : ৬২)
বিপদগ্রস্ত বান্দার কাছে আল্লাহ যা চান
আল্লাহ বিপদ-আপদের মাধ্যমে বান্দাকে পরীক্ষা করেন এবং তিনি চান বান্দা যেন তাঁর অভিমুখী হয়। তারা যেন তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে। বিপদগ্রস্ত হওয়ার পরও আল্লাহমুখী না হওয়া অতি নিন্দনীয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি মঙ্গল ও অমঙ্গল দ্বারা তাদেরকে পরীক্ষা করি, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ১৬৮)
আল্লাহ সবাইকে বিপদমুক্ত জীবন দান করুন। আমিন।







